প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৩:৪৫ (মঙ্গলবার)
শিক্ষা ব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমরা কি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলাতে পারব?

বিশ্ব আজ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence-AI) আর ভবিষ্যতের কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন AI-কে শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করছে, তখন প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি সেই যাত্রায় প্রস্তুত? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি বিশ্বমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারবে, নাকি আমরা আবারও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ট্রেনটি মিস করব?

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং সনদনির্ভর সফলতার ধারণায় আবদ্ধ। অথচ AI-এর যুগে শুধু তথ্য মুখস্থ রাখার মূল্য দ্রুত কমে যাচ্ছে। এখন মূল্যবান হচ্ছে বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।

বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের AI ব্যবহার শেখাচ্ছে। শুধু প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা নয়, আইন, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা, ব্যবসায় প্রশাসন কিংবা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও AI-নির্ভর শিক্ষা গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে তারা শিখছে AI-এর নৈতিক ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব। UNESCO-ও জোর দিয়ে বলছে, AI-ভিত্তিক শিক্ষা অবশ্যই মানবকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নৈতিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশেও পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে AI প্রস্তুতি মূল্যায়ন, নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ চলছে। UNESCO ও UNDP-এর সহায়তায় বাংলাদেশ একটি জাতীয় AI Readiness Assessment সম্পন্ন করেছে, যেখানে AI শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নৈতিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতার চিত্র এখনও ভিন্ন।

আজও দেশের বহু বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নেই, পর্যাপ্ত কম্পিউটার নেই, অনেক শিক্ষকের ডিজিটাল দক্ষতা সীমিত, আর গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সুযোগে রয়েছে বড় বৈষম্য। পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, উপকরণ এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, শিক্ষা সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করছে বাস্তব শ্রেণিকক্ষের প্রস্তুতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর।

শুধু প্রযুক্তি কিনলেই হবে না। AI যুগে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে মানুষের ওপর। একজন শিক্ষক যদি AI-কে ভয় পান, তবে শিক্ষার্থীও সেটিকে কেবল শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করবে। কিন্তু শিক্ষক যদি AI-কে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে শেখান, তাহলে শিক্ষার্থী নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারবে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভাষা। AI-এর অধিকাংশ উন্নত উপকরণ এখনও ইংরেজিনির্ভর। ফলে বাংলা ভাষায় উচ্চমানের ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী, গবেষণা এবং AI টুল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। মাতৃভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ছাড়া ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, প্রকৌশল কিংবা প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই AI কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতের চাকরিতে শুধু ডিগ্রি নয়, লাগবে অভিযোজনের ক্ষমতা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে AI Literacy বাধ্যতামূলক করা, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল নৈতিকতা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষা চালু করা জরুরি।

বাংলাদেশ কি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলাতে পারবে?

আমার বিশ্বাস—পারবে, তবে শর্ত একটাই। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শিক্ষা সংস্কারকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এনে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। শিক্ষককে প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের সংযোগ জোরদার করতে হবে এবং বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই ডিজিটাল দক্ষতা শেখাতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, AI-কে প্রতিযোগী নয়, সহযোগী হিসেবে দেখতে হবে। কারণ AI মানুষের বিকল্প নয়; বরং দক্ষ মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যে জাতি AI-কে ব্যবহার করতে শিখবে, ভবিষ্যতের অর্থনীতি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে নেতৃত্ব তারাই দেবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে পুরোনো পরীক্ষানির্ভর, মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা ধরে রাখা; অন্যদিকে জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলা। সিদ্ধান্তটি আমাদেরই।

আজ যে শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে, সে ২০৪০ সালের কর্মবাজারে প্রবেশ করবে। তখন তার প্রতিযোগী শুধু পাশের জেলার শিক্ষার্থী হবে না; হবে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের তরুণও। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এখনই বদলাতে হবে।

প্রশ্ন একটাই—আমরা কি পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেব, নাকি পরিবর্তনের পেছনে হাঁটব?

— এম মোস্তফা
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক, তৃতীয়বাংলা
ট্রেজারার, বাংলা প্রেস ক্লাব মিডল্যান্ডস, বার্মিংহাম