প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ০২:১৭ (মঙ্গলবার)
সারাবিশ্ব কোন পথে? উদ্বিগ্ন জেনারেশন Z-এর চোখে ভবিষ্যৎ

একটা প্রশ্ন আজ পৃথিবীর প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে—কেন বিশ্বের তরুণেরা এত অস্থির? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো বারবার প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিচ্ছে? কেন দক্ষিণ এশিয়ার রাস্তায় ছাত্রদের পদচারণা এত ঘন ঘন শোনা যায়, অথচ অনেকেই মনে করেন ইউরোপ বা আমেরিকা যেন তুলনামূলকভাবে শান্ত?

প্রশ্নটি সহজ, উত্তরটি মোটেও নয়।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কা—প্রতিটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস খুলে দেখুন। কোথাও আন্দোলন হয়েছে শিক্ষা ও চাকরির ন্যায্যতার দাবিতে, কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কোথাও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিবাদে, কোথাও নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক ধস দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যখন জনগণের আস্থা হারায়, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের ছাত্ররাজনীতিও বারবার রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেছে—কখনও সফল হয়েছে, কখনও ব্যর্থ, কখনও মূল্য দিয়েছে জীবন দিয়ে।

কিন্তু একটি ভুল ধারণা আমাদের ভাঙতেই হবে। ইউরোপ, আমেরিকা বা বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ছাত্র আন্দোলনমুক্ত—এ ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ফ্রান্সে শিক্ষা ও সামাজিক নীতি, যুক্তরাজ্যে টিউশন ফি, যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ, বন্দুক সহিংসতা, বিশ্ববিদ্যালয় নীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাত—এসব ইস্যুতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছে। পার্থক্য একটাই—সেসব দেশে রাজপথের পাশাপাশি আদালত, সংসদ, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং শক্তিশালী নাগরিক প্রতিষ্ঠানও পরিবর্তনের কার্যকর পথ তৈরি করে। ফলে প্রতিবাদই একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে না।

দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল। বিচার পেতে সময় লাগে, নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত, আর তরুণদের সামনে বেকারত্ব ও বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া। ফলে ক্ষোভ জমতে জমতে একসময় বিস্ফোরণে রূপ নেয়।

আজকের তরুণ প্রজন্ম—জেনারেশন Z—আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু একই সঙ্গে বেশি উদ্বিগ্ন। তাদের হাতে স্মার্টফোন, সামনে পুরো পৃথিবী। গাজায় বোমা পড়ুক, ইউক্রেনে যুদ্ধ চলুক, আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষ হোক কিংবা নিজেদের দেশে অন্যায়—সবকিছু মুহূর্তেই তাদের চোখের সামনে চলে আসে। তথ্যের এই বিস্ফোরণ তাদের সচেতন করেছে, আবার একই সঙ্গে ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধও করেছে।

এই প্রজন্ম শুধু চাকরি চায় না; তারা মর্যাদা চায়। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; তারা ন্যায়বিচার চায়। শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; তারা জবাবদিহি চায়। তারা এমন রাষ্ট্র চায়, যেখানে নাগরিকের কণ্ঠকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখা হবে না।

তাই একটি প্রশ্ন আজ বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হচ্ছে—রাষ্ট্র কি ক্রমশ আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে দিতে হবে। সত্য হলো, বিশ্বের কিছু দেশে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বেড়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আবার একই সময়ে অনেক দেশেই আদালত, নির্বাচন, নাগরিক আন্দোলন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের শক্তি ধরে রেখেছে। অর্থাৎ পৃথিবী একমুখী পথে হাঁটছে না; বরং দুই বিপরীত প্রবণতার টানাপোড়েনে এগোচ্ছে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু একনায়কতন্ত্র নয়; গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অবিশ্বাস। যখন মানুষ বিশ্বাস হারায় যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন সম্ভব, তখনই রাজপথ উত্তপ্ত হয়। আর যখন তরুণরা বিশ্বাস হারায় যে মেধা, শ্রম ও সততার মূল্য আছে, তখন প্রতিবাদ তাদের কাছে বিকল্প নয়—অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্দোলন কোনো জাতির ব্যর্থতার একমাত্র চিহ্ন নয়। আবার আন্দোলনের অনুপস্থিতিও সুস্থ রাষ্ট্রের প্রমাণ নয়। অনেক দেশে মানুষ স্বাধীনভাবে প্রতিবাদ করতে পারে; অনেক দেশে পারে না। নীরবতা কখনও স্থিতিশীলতার লক্ষণ, আবার কখনও ভয়ের আরেক নাম।

রাষ্ট্র যদি ছাত্রদের কেবল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, আর রাজনৈতিক দলগুলো যদি তরুণদের কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে দেখে, তবে সংকট আরও গভীর হবে। একইভাবে, আন্দোলন যদি সংলাপের সব দরজা বন্ধ করে দেয়, তবুও স্থায়ী সমাধান আসে না। গণতন্ত্রের শক্তি সংঘর্ষে নয়; মতভেদকে আলোচনায় রূপান্তর করার সক্ষমতায়।

আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো স্লোগান নয়; নতুন এক সামাজিক চুক্তি। এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সরকার জবাবদিহি করবে, বিরোধী মতকে সম্মান করা হবে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র, আর তরুণেরা অনুভব করবে—তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া নেওয়া হবে না।

জেনারেশন Z কোনো সমস্যার নাম নয়। তারা একটি আয়না। সেই আয়নায় রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখছে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই প্রতিচ্ছবি বদলাতে প্রস্তুত, নাকি আয়নাকেই দোষ দিতে থাকব?

ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্র তার তরুণদের কথা শোনে, সে রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর যে রাষ্ট্র তরুণদের কণ্ঠকে দমন করে, ইতিহাস একদিন তার কাছ থেকেও জবাব চায়।

সময় এখন সেই জবাব দেওয়ার।