প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ০২:৩০ (মঙ্গলবার)
সাইকেল ডেলিভারি রাইডার: জননিরাপত্তা, আইন ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন?

তৃতীয়বাংলা নিউজ ডেস্ক: 

যুক্তরাজ্যে দিন দিন বাড়ছে সাইকেলভিত্তিক ফুড ডেলিভারি রাইডারের সংখ্যা। তবে এর পাশাপাশি জননিরাপত্তা, সড়ক দুর্ঘটনা, বীমা এবং দুর্ঘটনার পর দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিরা।

যুক্তরাজ্যের আইনে সাইকেলের জন্য কোনো রেজিস্ট্রেশন নম্বর বা বাধ্যতামূলক বীমা নেই। ফলে কোনো সাইকেল আরোহী দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে তাকে শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। মোটরগাড়ির মতো নম্বরপ্লেট না থাকায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দাবি করাও জটিল হয়ে যেতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় তদন্তকারীরা সাধারণত সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, পুলিশের রিপোর্ট, ছবি, জিপিএস তথ্য এবং ডেলিভারি অ্যাপের রেকর্ডের ওপর নির্ভর করেন। যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে কাজ করে থাকেন, তাহলে কোম্পানির রেকর্ডের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। কিছু ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান কর্মরত অবস্থায় তাদের রাইডারদের জন্য থার্ড-পার্টি লাইয়াবিলিটি ইনস্যুরেন্স প্রদান করে, তবে সেটি নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ এবং সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়।

স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশ থেকে আসা অনেক ব্যক্তি সাইকেল ডেলিভারির কাজ শুরু করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ যুক্তরাজ্যের হাইওয়ে কোড, সড়ক চিহ্ন (Road Signs) এবং ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই রাস্তায় নামছেন। আবার অনেকের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান সীমিত হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ, জরুরি সেবা বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সব বিদেশি রাইডারের ক্ষেত্রে এমনটি প্রযোজ্য নয় এবং বর্তমানে এমন কোনো সরকারি তথ্য নেই যা প্রমাণ করে যে বিদেশ থেকে আসা রাইডাররাই বেশি দুর্ঘটনা ঘটান। তবে বিভিন্ন মহলের দাবি, যারা বাণিজ্যিকভাবে ডেলিভারির কাজ করবেন, তাদের জন্য যুক্তরাজ্যের সড়ক আইন, ট্রাফিক চিহ্ন এবং নিরাপদ সাইকেল চালনার ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত।

অ্যাকাউন্ট ভাড়া ও অবৈধ কার্যক্রম নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

এর পাশাপাশি আরও একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কমিউনিটির অনেকেই। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি নিজের নামে নিবন্ধিত ডেলিভারি অ্যাকাউন্ট অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে ভাড়া দেন বা ব্যবহার করতে দেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে অন্যের পরিচয় বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ডেলিভারির কাজ করার অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্ল্যাটফর্মের অনুমোদিত Substitution ব্যবস্থার বাইরে এ ধরনের অ্যাকাউন্ট শেয়ারিং বা ভাড়া দেওয়া অধিকাংশ ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার পরিপন্থী। এতে শুধু কোম্পানির নিয়মই লঙ্ঘিত হয় না, বরং দুর্ঘটনা ঘটলে প্রকৃত রাইডার কে ছিলেন, তিনি বীমার আওতায় ছিলেন কি না এবং দায়ভার কার ওপর বর্তাবে—এসব বিষয় নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি নিবন্ধিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ডেলিভারি করেন এবং তিনি কোনো দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তদন্ত, বীমা দাবি এবং ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে যেতে পারে। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে বিলম্বের মুখে পড়তে পারেন।

কমিউনিটির একাংশের দাবি, পরিচয় যাচাই আরও কঠোর করা, নিয়মিত অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধভাবে অ্যাকাউন্ট ভাড়া দেওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যে সাইকেল ডেলিভারি রাইডারদের দুর্ঘটনা নিয়ে আলাদা কোনো জাতীয় তথ্যভাণ্ডার (National Database) নেই। ফলে বছরে কতটি দুর্ঘটনা ঘটছে, কী ধরনের দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে বা কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।

সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল মনে করছে, বাণিজ্যিকভাবে সাইকেল ব্যবহার করে ডেলিভারির ক্ষেত্রে ন্যূনতম নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, উপযুক্ত বীমা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে আরও কার্যকর পরিচয় যাচাই বা নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

প্রযুক্তিনির্ভর ডেলিভারি সেবার বিস্তার যেমন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ আরও কার্যকর করার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেলিভারি খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, সঠিক প্রশিক্ষণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর আরও শক্তিশালী জবাবদিহিতা। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বৈধভাবে কাজ করা হাজারো পরিশ্রমী রাইডারের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে।