✍️ এম মোস্তফা
"শ্রাবণের মেঘগুলো জড় হলো আকাশে"—নব্বই দশকের বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এটি কেবল একটি জনপ্রিয় গান নয়; এটি একটি প্রজন্মের অনুভূতি, তারুণ্যের স্মৃতি এবং ভালোবাসার ভাষা। ক্যাসেটের যুগে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে যেমন এই গানটি নস্টালজিয়ার প্রতীক, তেমনি ইউটিউব, ফেসবুক ও রিলসের যুগে বেড়ে ওঠা জেনারেশন জেড-এর কাছেও এটি নতুনভাবে আবিষ্কৃত এক "সং অফ বিউটি"।
একটি সত্যিকারের শিল্পকর্ম কখনো সময়ের কাছে পরাজিত হয় না। মাধ্যম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, প্রজন্ম বদলায়; কিন্তু ভালো শিল্প নতুন সময়ে নতুন ভাষা খুঁজে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই নতুন ভাষারই নাম। আজ একটি পুরোনো গানও রিলসের মাধ্যমে নতুন জীবন পায়, নতুন দর্শক পায়, নতুন ব্যাখ্যা পায়।
সম্প্রতি সিলেটের অপরূপ প্রকৃতিকে পটভূমি করে একজন শিক্ষিকার নির্মিত কয়েকটি রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাহাড়, চা-বাগান, বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি আর সেই চিরসবুজ গান—সব মিলিয়ে ভিডিওগুলো অনেকের মন ছুঁয়ে গেছে। সেখানে অনেকে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই দেখেননি; দেখেছেন একজন মানুষের নিজের মতো করে বাঁচার আনন্দ, শিল্পবোধ এবং নান্দনিক প্রকাশ।
কিন্তু এখানেই আমাদের সমাজের একটি পুরোনো প্রবণতা সামনে আসে। আমরা খুব সহজেই অন্যের ব্যক্তিগত আনন্দকে বিচার করতে শুরু করি। কেউ নিজের ভালো লাগা প্রকাশ করলেই তার পেশা, পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থানকে সামনে এনে প্রশ্ন তোলা হয়। বিশেষ করে তিনি যদি শিক্ষক বা শিক্ষিকা হন, তাহলে যেন তার ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতার ওপরও অলিখিত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
প্রশ্ন হলো—একজন শিক্ষক কি শুধুই শ্রেণিকক্ষের মানুষ? তিনি কি গান ভালোবাসতে পারেন না? প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে পারেন না? একটি সুন্দর রিল তৈরি করে নিজের শহরকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে পারেন না?
আমার কাছে এর উত্তর স্পষ্ট—অবশ্যই পারেন।
কারণ, শিক্ষক হওয়া মানে ব্যক্তিসত্তাকে বিসর্জন দেওয়া নয়। একজন শিক্ষকও একজন শিল্পপ্রেমী মানুষ, একজন ভ্রমণপিপাসু মানুষ, একজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ হতে পারেন। তিনি যদি তার ব্যক্তিগত পরিসরে সৃজনশীলতার মাধ্যমে আনন্দ খুঁজে নেন এবং তাতে সমাজের কোনো ক্ষতি না হয়, তাহলে সেটিকে নেতিবাচক চোখে দেখার কোনো যুক্তি নেই।
বরং ইতিবাচকভাবে দেখলে, এই ধরনের উদ্যোগ একটি অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকেও তুলে ধরে। সিলেটের সৌন্দর্য আজ কোটি মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেকেই হয়তো সেই ভিডিও দেখে প্রথমবারের মতো সিলেটকে নতুন করে চিনেছেন। একটি গান, কিছু মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং একজন মানুষের আন্তরিক উপস্থাপন—এভাবেই একটি অঞ্চল নতুন পরিচয় লাভ করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ আছে। সেই জগতে সে নিজের মতো করে আনন্দ খুঁজে নেয়, নিজেকে প্রকাশ করে। সেই ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করাই সভ্যতার পরিচয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই প্রকাশ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে না কিংবা সামাজিক মূল্যবোধকে আঘাত করছে না, ততক্ষণ তা নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ভাইরাল হওয়া যেমন সহজ, তেমনি অকারণ সমালোচনার শিকার হওয়াও সহজ। তাই এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দরকার ইতিবাচক মানসিকতা এবং সহনশীলতা। একজন শিক্ষিকার পরিচয় তার দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা ও শিক্ষাদানে। একটি নান্দনিক রিল সেই পরিচয়কে খাটো করে না; বরং প্রমাণ করে, তিনি জীবন ও সৌন্দর্যকে অনুভব করতে জানেন।
হয়তো এ কারণেই "শ্রাবণের মেঘগুলো জড় হলো আকাশে" গানটি তিন দশক পরেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, সৌন্দর্যের কোনো মেয়াদ থাকে না। সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু সৌন্দর্যকে অনুভব করার মানবিক ক্ষমতা কখনো পুরোনো হয় না।
আমরা যদি মানুষের আনন্দকে সম্মান করতে শিখি, তাহলে সমাজ আরও উদার হবে, আরও সহনশীল হবে। আর যদি একজন শিক্ষিকার ক্যামেরায় ধরা পড়া সিলেটের সৌন্দর্য পৃথিবীর মানুষকে মুগ্ধ করে, তাহলে সেটিকে সমালোচনার নয়, প্রশংসার চোখেই দেখা উচিত। কারণ, সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেওয়াও এক ধরনের শিক্ষা।
✍️ এম মোস্তফা
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.