প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ০০:৫১ (বৃহস্পতিবার)
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যেন ‘সিলেট উৎকোচ কর্তৃপক্ষ’ না হয়

এম মোস্তফা, সম্পাদকের ডেস্ক : সিলেটের পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সম্প্রসারণশীল একটি নগরীর আবাসন, সড়ক, জলাবদ্ধতা, পাহাড়-টিলা, জলাশয় ও অবকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনার জন্য শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের আশীর্বাদই একসময় সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তাই শুরু থেকেই একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি—সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যেন কোনোভাবেই ‘সিলেট উৎকোচ কর্তৃপক্ষ’-এ পরিণত না হয়।

বাংলাদেশে নগর উন্নয়ন ও নির্মাণসংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলোর একটি হলো হয়রানি ও দুর্নীতি। একটি বাড়ির নকশা অনুমোদন, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন, প্রকল্পের ছাড়পত্র কিংবা ভবন নির্মাণের অনুমতির মতো সেবা যদি অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে, তখনই দালালচক্র ও ঘুষের সুযোগ তৈরি হয়। ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরবে, আর টাকা না দিলে কাজ এগোবে না—সিলেটবাসী নতুন কর্তৃপক্ষের কাছে এমন ব্যবস্থা দেখতে চায় না।

নতুন কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন সহজ করা, কঠিন করা নয়। নকশা অনুমোদনসহ প্রতিটি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব অনলাইনভিত্তিক করতে হবে। কে কোন ফাইলের দায়িত্বে আছেন, কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা এবং কেন কোনো আবেদন আটকে আছে—এসব তথ্য আবেদনকারী যেন সহজেই জানতে পারেন। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ কমবে এবং দালালনির্ভর ব্যবস্থাও দুর্বল হবে।

আরেকটি বড় আশঙ্কা হচ্ছে প্রভাবশালীদের স্বার্থ। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এমন প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত নয় যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য এক নিয়ম, আর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের জন্য আরেক নিয়ম থাকবে। অবৈধ ভবন, পাহাড়-টিলা কাটা, জলাশয় ভরাট কিংবা অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্প—অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, আইনের প্রয়োগ হতে হবে সমানভাবে।

সিলেটের উন্নয়ন শুধু বহুতল ভবন, নতুন রাস্তা কিংবা আবাসিক প্রকল্প নির্মাণের নাম নয়। সিলেটের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষাও উন্নয়নের অংশ। টিলা, ছড়া, খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ ধ্বংস করে কংক্রিটের নগরী বানানো হলে তাকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে তাই ভূমি ব্যবসায়ী বা আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থের চেয়ে নগরবাসী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা নিয়োগেও সততা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থা, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব, গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদনের ডিজিটাল রেকর্ড এবং বড় প্রকল্পের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার ব্যবস্থাও স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের অংশগ্রহণ। সিলেট কেমন শহর হবে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু কয়েকজন আমলা, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী নেবেন—এমনটি হওয়া উচিত নয়। নগর পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, নগর বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং তরুণদের মতামত নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনই শেষ কথা নয়; প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। একটি নতুন প্রতিষ্ঠান মানে নতুন অফিস, নতুন পদ এবং নতুন ক্ষমতা নয়—এর অর্থ হওয়া উচিত নাগরিকের জন্য উন্নত, দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা।

সিলেটবাসী উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়নের নামে হয়রানি চায় না। পরিকল্পনা চায়, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা চায় না। কর্তৃপক্ষ চায়, কিন্তু উৎকোচের কর্তৃপক্ষ চায় না।

সুতরাং এখনই দাবি উঠুক—সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হোক স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান। কারণ সিলেটের উন্নয়নের দায়িত্বে যে প্রতিষ্ঠান থাকবে, তার প্রথম পরিচয় হতে হবে সততা; ক্ষমতা নয়।