প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৩ (শুক্রবার)
বার্মিংহামে ৪০ থেকে ৩০ মাইল গতিসীমা: সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কতটা কার্যকর হবে নতুন নিয়ম?

এম মোস্তফা, ডেস্ক রিপোর্ট : বার্মিংহামের ২৭টি প্রধান সড়কে ঘণ্টায় ৪০ মাইলের গতিসীমা কমিয়ে ৩০ মাইল করা হয়েছে। সড়কে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। গবেষণা বলছে, যানবাহনের গড় গতি মাত্র ১ মাইল কমলেও সংঘর্ষের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তবে বার্মিংহামের নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত প্রভাব বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে পর্যাপ্ত দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্যের জন্য।

 

যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ শহর বার্মিংহামে সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে প্রায় সব ৪০ মাইল গতিসীমার সড়ককে ৩০ মাইলে নামিয়ে এনেছে Birmingham City Council। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর কাউন্সিল জানায়, শহরের ২৭টি প্রধান সড়কে নতুন গতিসীমা কার্যকরের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এর ফলে শহরের প্রায় সব সড়কের সর্বোচ্চ আইনগত গতিসীমা এখন ঘণ্টায় ৩০ মাইল বা তার কম। ব্যতিক্রম হিসেবে A38(M) Aston Expressway, A38 Quinton Expressway এবং Walsall সীমান্তবর্তী A4041 Queslett Road-এ উচ্চতর গতিসীমা বহাল রয়েছে।

প্রকল্পটির অনুমোদিত বাজেট ছিল ৬ লাখ ৫৬ হাজার পাউন্ড (£656,000)। Birmingham City Council জানিয়েছে, এই অর্থ এসেছে শহরের Clean Air Zone (CAZ)-এর উদ্বৃত্ত রাজস্ব থেকে এবং আইন অনুযায়ী ওই অর্থ পরিবহন-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেই ব্যয় করতে হয়।

কেন ৪০ থেকে ৩০ মাইল?

গতিসীমা কমানোর পেছনে মূল যুক্তি—গতি যত বেশি, সংঘর্ষের ঝুঁকি ও সংঘর্ষে আঘাতের তীব্রতা তত বাড়ে।

Birmingham City Council-এর তথ্যে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডে ২০২২ সালে প্রতি মাইল ভ্রমণের হিসাবে ৪০ মাইল গতিসীমার সড়কে মৃত্যুর হার ৩০ মাইল সড়কের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

UK Government-এর স্থানীয় গতিসীমা নির্ধারণসংক্রান্ত নির্দেশিকায় উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, যানবাহনের গড় গতি প্রতি ১ মাইল কমলে সংঘর্ষের হার সাধারণভাবে প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। একই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, গতি কমলে শুধু সংঘর্ষের আশঙ্কাই কমে না, দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানির ঝুঁকিও কমে।

বার্মিংহাম কাউন্সিলের প্রকাশিত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, তাদের ব্যবহৃত গবেষণা অনুযায়ী ৪০ থেকে ৩০ মাইলে গতি কমলে সংঘর্ষের সংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। শহরের কিছু সড়কের ক্ষেত্রে প্রাণহানি সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ শতাংশ কমার সম্ভাবনারকথাও উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ৫০ বা ৬০ শতাংশ বার্মিংহামে নতুন গতিসীমা কার্যকরের পর ইতোমধ্যে অর্জিত দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি হ্রাসের হার নয়। এগুলো গবেষণা ও পূর্বাভাসভিত্তিক সম্ভাব্য প্রভাব।

প্রকৃত ফল জানতে অপেক্ষা

নতুন ৩০ মাইল গতিসীমা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর এখনো এমন দীর্ঘ সময়ের তথ্য পাওয়া যায়নি, যা দিয়ে আগের ৪০ মাইল ব্যবস্থার সঙ্গে নির্ভরযোগ্যভাবে কয়েক বছরের ‘before-and-after’ তুলনা করা যায়।

ফলে নতুন নিয়মের কারণে বার্মিংহামে ঠিক কত শতাংশ দুর্ঘটনা, মৃত্যু বা গুরুতর আহতের ঘটনা কমেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না।

এ ক্ষেত্রে আগামী কয়েক বছরের collision, casualty এবং killed or seriously injured (KSI) তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, শুধু আইনগত সীমা কমানো নয়, সড়কে যানবাহনের প্রকৃত গড় গতিও কতটা কমেছে।

কারণ সরকারি নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, স্থানীয় গতিসীমা আলাদাভাবে নির্ধারণ করলেই যথেষ্ট নয়; যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর অন্যান্য ব্যবস্থার সঙ্গে এটি সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন।

গতি কমলে কেন জীবন বাঁচতে পারে?

এর পেছনের ব্যাখ্যা তুলনামূলক সরল। কম গতিতে চললে সামনে বিপদ দেখা দেওয়ার পর চালক প্রতিক্রিয়া জানানো এবং গাড়ি থামানোর জন্য বেশি সুযোগ পান। একই সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটলেও কম গতির কারণে আঘাতের তীব্রতা সাধারণত কম হয়।

Birmingham City Council-এর প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রাণঘাতী সড়ক সংঘর্ষের প্রায় ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে গতি একটি factor হিসেবে কাজ করে।

UK Government-এর Highway Code-ও বলছে, আইনগত গতিসীমা কোনো পরিস্থিতিতেই সবসময় নিরাপদ গতি বোঝায় না। অনুপযুক্ত বা অতিরিক্ত গতি সংঘর্ষের সম্ভাবনা এবং দুর্ঘটনার তীব্রতা—দুটিই বাড়াতে পারে।

যাত্রার সময় কতটা বাড়বে?

গতিসীমা ১০ মাইল কমানোয় যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে—এমন উদ্বেগও রয়েছে।

তবে Birmingham City Council-এর হিসাবে, যানজটমুক্ত সড়কে ঘণ্টায় ৪০ মাইলের পরিবর্তে ৩০ মাইলে চললে প্রতি মাইলে আনুমানিক ১০ থেকে ৩০ সেকেন্ড অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। শহরের বাস্তব পরিস্থিতিতে ট্রাফিক লাইট, জংশন এবং যানবাহনের চাপ যাত্রার সময় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখায় গতিসীমা কমানোর প্রভাব তুলনামূলক সীমিত হতে পারে বলে কাউন্সিলের যুক্তি।

নতুন ক্যামেরা নয়, পুরোনোগুলো পুনর্বিন্যাস

নতুন গতিসীমা কার্যকর করতে সব সড়কে নতুন speed camera বসানো হয়নি। তবে বিদ্যমান ক্যামেরাগুলোকে নতুন ৩০ মাইল গতিসীমা প্রয়োগের উপযোগী করে পুনর্বিন্যাস বা recalibrate করা হয়েছে।

কাউন্সিল জানিয়েছে, নতুন সীমা মানার ক্ষেত্রে সমস্যা অব্যাহত থাকলে অতিরিক্ত ব্যবস্থা বিবেচনা করা হতে পারে। পাশাপাশি enforcement বাড়াতে West Midlands Police ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সাইনবোর্ড বদলালেই কি দুর্ঘটনা কমবে?

বার্মিংহামের উদ্যোগের সাফল্য শেষ পর্যন্ত শুধু সাইনবোর্ডে ‘40’ বদলে ‘30’ হওয়ার ওপর নির্ভর করবে না।

আইন পরিবর্তনের পর চালকের আচরণ কতটা বদলাচ্ছে, পুলিশের enforcement কতটা কার্যকর হচ্ছে, বিদ্যমান ক্যামেরার ব্যবহার এবং—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সড়কে যানবাহনের প্রকৃত গড় গতি কতটা কমছে, তার ওপরও ফলাফল নির্ভর করবে।

অতীতের গবেষণাও দেখিয়েছে, শুধু সাইন দিয়ে গতিসীমা কমালেই সব ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে না। উদাহরণ হিসেবে, Department for Transport-এর ২০ মাইল গতিসীমা নিয়ে একটি গবেষণায় গড় গতিতে সামান্য হ্রাস পাওয়া গেলেও আবাসিক এলাকায় সংঘর্ষ ও হতাহতের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফলে বার্মিংহামের নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে বাস্তব সড়কে।

৩০ মাইল গতিসীমা চালুর পর শহরের সড়কে সংঘর্ষ, মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা বাস্তবে কতটা কমে—তার নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলবে পর্যাপ্ত সময়ের before-and-after collision ও casualty data প্রকাশের পর।

তবে বিদ্যমান গবেষণা একটি বিষয় স্পষ্ট করে: গড় গতি সত্যিই কমানো সম্ভব হলে সংঘর্ষের ঝুঁকি এবং দুর্ঘটনায় গুরুতর পরিণতির আশঙ্কা কমার শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বার্মিংহামের নতুন ৩০ মাইল নীতি সেই গবেষণালব্ধ সম্ভাবনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে পারে কি না।