প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৫১ (মঙ্গলবার)
নেপালের গোরখায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ভেসে গেছে বহু বাড়িঘর ও সেতু

গোরখা, নেপাল, ১১ অক্টোবর ২০২৬: নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় গোরখা জেলায় বুড়ি গণ্ডকী নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেসে গেছে। বন্যার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

রোববার সকালে গোরখা জেলার চুমনুব্রি ও ধরচে এলাকার বিভিন্ন জনবসতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, লোকপা ও চুমলিং এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে ভূমিধসের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। পরে সেই অস্থায়ী বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলিমাটি নিচের দিকে নেমে আসে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো। সূত্র: Radio Nepal⁠, The Kathmandu Post⁠।

বাড়িঘর, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যাপক ক্ষতি

বন্যার পানির তোড়ে নদীতীরবর্তী বসতিগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে কয়েক ডজন বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক ঝুলন্ত সেতু ও মোটরযান চলাচলের উপযোগী সেতু ভেসে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় আরও বহু পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থল, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুতের খুঁটি এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে বুড়ি গণ্ডকী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের নেপাল কার্যালয় জানিয়েছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে সেতু, জলবিদ্যুৎ স্থাপনা, সড়ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে শত শত পরিবারের জীবনযাত্রা ও জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

সূত্র: জাতিসংঘের নেপাল কার্যালয়, ১১ অক্টোবর ২০২৬⁠।

নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান

বন্যার পরপরই নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধারকাজে নিয়োজিত করা হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রাথমিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তত পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন নারী ও তিনজন পুরুষ বলে জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ৮২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে নয়জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় নিখোঁজের সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে।

কর্তৃপক্ষ নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সম্ভাব্য নতুন ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

সূত্র: Al Jazeera, ১১ অক্টোবর ২০২৬⁠।

আগাম সতর্কবার্তার গুরুত্ব

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, আগাম সতর্কবার্তা ও মোবাইল ফোনে পাঠানো এসএমএসের মাধ্যমে নদীর নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছিল। এর ফলে অনেক মানুষ দ্রুত উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পান। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছানো যে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, এই ঘটনা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং মানবিক সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুর্গম এলাকাগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট চিত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

নতুন দুর্যোগে উদ্বেগ বাড়ছে

নেপাল এখনো সাম্প্রতিক মাসগুলোর ভয়াবহ বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে গোরখার নতুন আকস্মিক বন্যা দেশটির দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং পাহাড়ি নদীর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে অস্থায়ী জলাধার তৈরি হতে পারে। সেই বাধা হঠাৎ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানি নিচের জনবসতিতে নেমে আসে। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়মিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি।

গোরখার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং জীবিকা ফিরিয়ে আনা এখন নেপাল সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো।