প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬ ১৭:৫৬ (শুক্রবার)
রামিসার খণ্ডিত দেহ ও বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার নীরব সংকট

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে ১৯ মে ২০২৬ মঙ্গলবার সকালে সাত-আট বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসা আক্তারকে পাশের ফ্ল্যাটে নিয়ে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরে তার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয় খাটের নিচে ও বাথরুমের বালতি থেকে। প্রধান অভিযুক্ত প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

কিন্তু এই দ্রুত গ্রেপ্তারও থামাতে পারেনি রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লার বুকফাটা আর্তনাদ। তিনি বলেছেন:

“আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।”

একজন শোকাহত পিতার এই কথাগুলো কেবল ব্যক্তিগত বেদনার বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থার প্রতিচ্ছবি। যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে অপরাধের বিচার হবে, তখন শুধু আইন নয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন দুর্বল:
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। দণ্ডবিধি ১৮৬০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এবং শিশু আইন ২০১৩-এ এসব অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালও গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

দেশের আদালতগুলোতে লাখ লাখ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্ত শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে, চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হয়, সাক্ষ্য গ্রহণ পিছিয়ে যায়, আর রায় পেতে পেরিয়ে যায় বহু বছর। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, দুর্বল ফরেনসিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং আদালতের অতিরিক্ত চাপ বিচার প্রক্রিয়াকে কার্যত অকার্যকর করে তোলে।
ফলে “দ্রুত গ্রেপ্তার” হলেও “দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার” হয় না। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমিয়ে দেয়।


শাস্তির কঠোরতা নয়, নিশ্চিত বিচারই বড় প্রতিরোধ: 
বাংলাদেশে প্রায়ই দাবি ওঠে ধর্ষণের শাস্তি আরও কঠোর করতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু কঠোর শাস্তি অপরাধ কমাতে যথেষ্ট নয়; বরং অপরাধী নিশ্চিতভাবে ধরা পড়বে এবং দ্রুত বিচার হবে এই বিশ্বাসই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করে।

যখন একজন অপরাধী জানে যে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা দীর্ঘসূত্রতার আড়ালে সে পার পেয়ে যেতে পারে, তখন আইনের ভয় কমে যায়। অপরদিকে, দ্রুত তদন্ত, শক্তিশালী ফরেনসিক এভিডেন্স এবং সময়মতো বিচার অপরাধ দমনে বাস্তব ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখার আছে: 
যুক্তরাজ্যেও যৌন অপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত শক্তি রয়েছে, যা বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি কার্যকর।
এখানে পুলিশের তদন্ত সাধারণত দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত হয়। Crown Prosecution Service (CPS) প্রমাণ পর্যালোচনা করে অভিযোগ গঠন করে। DNA পরীক্ষা, CCTV ফুটেজ, ডিজিটাল এভিডেন্স এবং আধুনিক ফরেনসিক ব্যবস্থার ব্যবহার তদন্তকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে সাক্ষী সুরক্ষা ও সময়সীমাভিত্তিক কেস ম্যানেজমেন্ট বিচার প্রক্রিয়াকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর রাখে।

ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:
"Justice must not only be done, but must also be seen to be done.”
অর্থাৎ বিচার শুধু হলেই হবে না, জনগণকেও দেখতে হবে যে বিচার সত্যিই হয়েছে।
বাংলাদেশের সংকট ঠিক এখানেই মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে যে বিচার দৃশ্যমানভাবে সম্পন্ন হবে।

শুধু আইন নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার:
রামিসার মতো শত শত শিশুর নির্মম মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে: বিচ্ছিন্ন কিছু গ্রেপ্তার বা তাৎক্ষণিক ক্ষোভ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিচারব্যবস্থার গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।

এই সংস্কারের অংশ হিসেবে জরুরি:
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল গঠন;
তদন্ত ও চার্জশিটের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ;
আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব ও ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট চালু করা;
সাক্ষী সুরক্ষা আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন;
পুলিশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা;
শিশু সুরক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
একই সঙ্গে আমাদের সমাজকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ, সামাজিক নীরবতা, ক্ষমতাবানদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং শিশু নিরাপত্তা বিষয়ে উদাসীনতা এসবও এই সংকটকে গভীর করেছে।


রামিসা ফিরবে না, কিন্তু রাষ্ট্র কি জাগবে?: 
রামিসা আর কখনও ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আরেকটি “আলোচিত ঘটনা” হয়ে কিছুদিন পর বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তাহলে আমরা শুধু একটি শিশুকেই হারাব না হারাব রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের শেষ আস্থাটুকুও।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে: সবচেয়ে দুর্বল শিশুটিও কি বিশ্বাস করতে পারে যে তার ওপর অপরাধ হলে বিচার হবে?
বাংলাদেশকে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে।
ধামাচাপা নয়, দৃশ্যমান ও দ্রুত বিচার চাই।
আর নয় শিশু হত্যা। আর নয় অসহায় পিতার কান্না।


রামিসাসহ সকল নির্মমভাবে হত্যাকৃত শিশুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।