প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬ ১৭:৪৩ (শুক্রবার)
কভেন্ট্রি রোড: ঈদের ধুম, কেনাকাটা আর আনন্দে মুখর স্মল হীথ —  ঐতিহ্যের টান, ত্যাগ ও ভালোবাসায় মিলবে ঈদের আনন্দ

ঘনিয়ে আসছে পবিত্র ঈদ-উল-আজহা। বার্মিংহামের স্মল হীথের প্রাণকেন্দ্র কভেন্ট্রি রোড এখন পুরোপুরি ঈদের রঙে সাজানো। প্রচণ্ড গরম আর প্রবল রোদ উপেক্ষা করেই সকাল থেকে রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল—পাঞ্জাবী, টুপি, নতুন পোশাক ও সুগন্ধি কেনাকাটায় দোকানগুলো ভরপুর। রাস্তার পাশে বসা অস্থায়ী দোকানগুলোতেও ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়; ঈদের নানা পণ্য ও সাজসামগ্রী কিনতে চারদিকে মানুষের ভিড় জমেছে।

 

রাস্তার পাশে মেহেদি শিল্পীদের আশেপাশে জমে উঠেছে বিশেষ ভিড়। মায়েরা স্নেহের হাত দিয়ে তাদের সোনামণিদের হাতে মেহেদীর নানা নকশা ও ফুল-লতার ছবি এঁকে দিচ্ছেন, যেন ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দের রঙ। শিশুদের মুখের হাসি দেখলে বোঝা যায়, তাদের কাছে ঈদ মানেই যেন এই সাজ, খুশি আর মিলনমেলা। পাশের পার্কেও বসেছে বিশাল ফানফেয়ার। স্কুলের ছুটি হওয়ায় বাচ্চারা দোলনা, নাগরদোলা ও খেলাধুলায় মেতে উঠেছে—পুরো এলাকা জুড়ে যেন বইছে আনন্দের জোয়ার। প্রবাসে থেকেও কেনাকাটা, সাজসজ্জা আর উৎসবের আমেজে পুরো পরিবেশটি হয়ে উঠেছে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় রঙিন।

 

শুধু বাহ্যিক সাজ বা কেনাকাটা নয়, এই ঈদের মূল চেতনা—আত্মত্যাগ ও ভালোবাসা, তা যেন বেঁচে আছে প্রবাসীদের হৃদয়েও। হাড়ভাঙা খাটুনির উপার্জন দেশে পাঠাচ্ছেন এখানকার প্রবাসীরা, যাতে নিজ নিজ পরিবার মিলেমিশে কোরবানির আনন্দ ভাগ করে নিতে পারেন। কোরবানিকে কেন্দ্র করে ফিরে আসছে আমাদের ঐতিহ্যের সোনালি দিন আর আত্মত্যাগের গৌরবময় স্মৃতি।

 

প্রবীণ বাসিন্দা আলহাজ্ব ইনতাজ খান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আগের দিনে প্রবাদ ছিল—যার নাই গরু, সে দুনিয়ার খোরো।” সেকালে গৃহস্থের গোয়ালের গরু ছিল সচ্ছলতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। তখন শেষ মুহূর্তে বাজার থেকে পশু কেনা হতো না; সারা বছর ঘরেই স্নেহ ও মমতায় লালন-পালন করা হতো কোরবানির পশু। পরিবারের শিশুরাও গরুকে ঘাস খাওয়ানো বা গোসল করানোর মধ্যে খুঁজে পেত অপার আনন্দ। পশুর প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই গড়ে উঠত প্রকৃত ত্যাগের মানসিকতা।

 

সেই ঐতিহ্যকে আজও অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করছেন বর্তমান প্রজন্মও। সব্বাই আহমেদ কবির জানান, তাঁরা সাতটি পরিবার মিলে সম্মিলিতভাবে একটি খামার থেকে গরু বুক করেছেন। ঈদের নামাজ শেষে পশু জবাই করার পর সবাই মিলে মাংস কাটবেন, রান্না করবেন এবং একসাথে খাবেন। তাঁর মতে, এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য—বাচ্চাদের মাঝে ত্যাগ, ভাগাভাগি ও সামাজিকতার শিক্ষা দেওয়া।

 

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাউ উদ্দিন জানান, তাঁর কোরবানির গরু ইতিমধ্যেই কেনা শেষ। তিনি বলেন, “দেশে আমার পরিবার-পরিজন খুশি মনে ঈদ উদযাপন করবেন—এটাই আমার কাছে বড় প্রাপ্তি ও আনন্দ।”

 

এলবি ২৪-এর সাংবাদিক ফখরুল ইসলাম রিপনের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। তিনি দেশে নিজের লোক দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করিয়েছেন একটি বিশাল আকারের লাল রঙের গরু, যা এবছর ইনশাআল্লাহ কোরবানি দেবেন। তাঁর মন্তব্য, “নিজের হাতে গড়া, নিজের পরিচর্যায় বড় করা পশু কোরবানি দেওয়ার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা—এর মাঝে থাকে গভীর এক ভালোবাসা ও তৃপ্তি।”

 

আত্মত্যাগের মহান আদর্শ আমাদের শিখিয়েছেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর সর্বোচ্চ ত্যাগের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোরবানি কখনোই শুধু পশু জবাই করার নাম নয়। পবিত্র কোরআনের সূরা আনআমে ঘোষণা করা হয়েছে:

 

“নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।”

 

নিজের ভেতরের পশুত্ব, স্বার্থপরতা ও অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা—এটাই কোরবানির মূল ও চিরন্তন শিক্ষা। প্রবাসের প্রাণ, ঐতিহ্যের টান আর ত্যাগের মন্ত্র নিয়ে এবারও ঈদ-উল-আজহা আমাদের জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সম্প্রীতি ও আল্লাহর অফুরন্ত রহমত।