প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬ ০২:১২ (রবিবার)
বাজেট ২০২৫-২৬: জনকল্যাণ, ডিজিটাল অর্থনীতি ও ইভি পাওয়ারের নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক পরিবর্তনের সময় অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কর ও শুল্ক কাঠামোতে এমন কিছু পরিবর্তন আনা, যা একদিকে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, ইভি খাত এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।

বাজেটের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এটি শুধু রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা নয়; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য একটি নীতিগত রোডম্যাপ। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং ইভি প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে সরকার একটি আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণের বার্তা দিয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে স্বস্তির আভাস

বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর ০.৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর।

খেজুর ও মসলার ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে খেজুর ও মসলা বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এর সুফল সরাসরি বাজারে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শিশুখাদ্যের কাঁচামালে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তও সময়োপযোগী। বর্তমান সময়ে শিশুখাদ্যের উচ্চমূল্য বহু পরিবারকে চাপে ফেলছে। কর কমার ফলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং বাজারমূল্যও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

অন্যদিকে কৃষিখাতের জন্য সার, কীটনাশক এবং পোল্ট্রি শিল্পে বিদ্যমান কর সুবিধা বহাল রাখা খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় মানবিক বাজেট

একটি কল্যাণরাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য যেসব কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও ব্লাড টিউবিংয়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমবে। বর্তমানে একজন রোগীকে প্রতি মাসে ডায়ালাইসিসের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই কর অব্যাহতি তাদের জন্য বাস্তব স্বস্তি বয়ে আনতে পারে।

হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সে ভ্যাট প্রত্যাহারও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাবে। বিশেষ করে হৃদরোগ ও চক্ষুরোগের চিকিৎসা সাধারণত ব্যয়বহুল হওয়ায় এই সিদ্ধান্তের সামাজিক গুরুত্ব অনেক।

সবচেয়ে মানবিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ক্যানসারের ওষুধ ও কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করা। ক্যানসার চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই উদ্যোগ রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী

বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র এখন প্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ছাড়া আধুনিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে প্রযুক্তি খাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

ল্যাপটপ, ডেস্কটপ এবং প্রিন্টারে শুল্ক-কর প্রত্যাহারের ফলে প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে। এর সুফল পাবেন শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা।

সার্ভার ও কম্পিউটার মনিটরে কর অব্যাহতি দেশের ডেটা সেন্টার, সফটওয়্যার শিল্প এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। একইভাবে কম্পিউটার এসএসডিতে রেগুলেটরি শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহার তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথ খুলে দিতে পারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের যাত্রায় এই সিদ্ধান্তগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

ইভি পাওয়ারে নতুন গতি

বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইভি (EV) এখন প্রযুক্তি ও অর্থনীতির নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগামী দশকের পরিবহন খাত যে বৈদ্যুতিক শক্তিনির্ভর হবে, সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

এবারের বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ির করহার কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু কর ছাড় নয়, বরং ভবিষ্যতের একটি নতুন শিল্পখাত গড়ে তোলার উদ্যোগ। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির করহার কমিয়ে ৩৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির করহার ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রেও কর কাঠামো সহজ করা হয়েছে। এর ফলে দেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো ইভি চার্জার এবং চার্জিং স্টেশনের ওপর সম্পূর্ণ কর প্রত্যাহার। কারণ একটি দেশের ইভি বিপ্লব নির্ভর করে তার চার্জিং অবকাঠামোর ওপর। সরকার এই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়িয়ে ভবিষ্যতের পরিবহন অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

আজকের বিশ্বে তেলভিত্তিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিদ্যুৎভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় বাজেটের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের ‘ইভি পাওয়ার’ যুগে প্রবেশের সূচনা বললে অত্যুক্তি হবে না।

সংস্কৃতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতিফলন

একটি জাতির উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না; সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গিটার, পিয়ানো ও ভায়োলিনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক যন্ত্রে কর ছাড় নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহিত করবে। চলচ্চিত্র শিল্পে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরায় শুল্ক কমানো দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

অন্যদিকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত সহায়ক যন্ত্রের ওপর কর অব্যাহতি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের ইতিবাচক বার্তা বহন করে। উন্নয়নের মূলধারায় সবাইকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা

যে কোনো বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে তার বাস্তবায়নের ওপর। কর কমানো বা শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা যদি বাজারে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না।

তাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজার তদারকি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং কর ছাড়ের সুবিধা যাতে ভোক্তার হাতে পৌঁছে তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা -

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটকে একটি ভবিষ্যতমুখী ও সংস্কারধর্মী বাজেট বলা যায়। এতে যেমন সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ রয়েছে, তেমনি স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ইভি প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি নিখুঁত বাজেট না হলেও এর মধ্যে একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতিফলন দেখা যায়। এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন। তাহলেই এই বাজেট কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

— এম মোস্তফা

সম্পাদক , তৃতীয়বাংলা