জাতীয়

মানুষ চাষের সময় এসেছে: বাংলাদেশের নতুন বিপ্লব

লেখক: এম মোস্তফা লিমন প্রকাশক ও সম্পাদক, তৃতীয়বাংলা

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ ১২:৪২

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো দক্ষতা, আধুনিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাবে নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না। তাই আজ সময় এসেছে নতুন ধরনের “চাষাবাদ”-এর— মানুষ চাষের।

এখানে “মানুষ চাষ” বলতে কোনো অবমাননাকর শব্দ বোঝানো হচ্ছে না। বরং এর অর্থ হলো একজন সাধারণ মানুষকে ধীরে ধীরে দক্ষ, সচেতন, কর্মক্ষম এবং বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা। যেমন একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করে যত্ন নিয়ে ফসল ফলান, তেমনি একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে মানুষের মাঝে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের বীজ বপন করতে হবে।

বাংলাদেশে এখনো হাজার হাজার তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে বেকার বসে থাকে। আবার অনেক শিল্প-কারখানা, আইটি প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি চাকরির বাজারে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের দেশে মানুষ আছে, কিন্তু দক্ষ মানুষ কম। এই জায়গাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আজকের পৃথিবীতে শুধু ডিগ্রি দিয়ে সফল হওয়া যায় না। প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা। একজন ভালো ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ওয়েব ডেভেলপার, নার্স, মেশিন অপারেটর কিংবা কৃষি বিশেষজ্ঞ— এদের চাহিদা দেশ ও বিদেশে অনেক বেশি। অথচ আমাদের সমাজে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে অনেক সময় ছোট করে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে উন্নত দেশ হতে চায়, তাহলে “মানুষ চাষ”কে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র, আধুনিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু শহরে নয়, গ্রামের তরুণদের কাছেও প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে।

একজন দক্ষ শ্রমিক শুধু নিজের ভাগ্য বদলায় না, পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থাও পরিবর্তন করে। একজন বিশেষজ্ঞ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্স বাড়বে, দেশের সম্মানও বাড়বে। আজ বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়, কিন্তু তারা চায় প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী।

মানুষ চাষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষা। শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও সমাজসেবামূলক মানুষ গড়ে তোলাও জরুরি। কারণ দক্ষতা ছাড়া যেমন উন্নয়ন অসম্ভব, তেমনি নৈতিকতা ছাড়া সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না।

আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— সবাইকে একসাথে এই উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। যুব সমাজকে হতাশা নয়, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের পথ দেখাতে হবে।

বাংলাদেশে জমি কমে যাচ্ছে, কৃষির পরিধি সীমিত হচ্ছে। কিন্তু মানুষ গড়ার ক্ষেত্র এখনো বিশাল। তাই আজকের সবচেয়ে লাভজনক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হলো “মানুষ চাষ”।

কারণ একটি ভালো ফসল এক মৌসুমের জন্য উপকার দেয়, কিন্তু একজন দক্ষ মানুষ একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন