প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ ০৩:২৯
একটি সংগঠন, তা রাজনৈতিক হোক বা সামাজিক—তার প্রাণশক্তি হলো তৃণমূলের সেই কর্মীরা, যারা সময়-অসময়ে, সুখ-দুঃখে, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে ভূমিকা রাখে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বড় বড় আন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা সংগঠনের টিকে থাকা—সবকিছুর পেছনে থাকে কিছু নিবেদিতপ্রাণ, নিঃস্বার্থ ও পরীক্ষিত কর্মীর ত্যাগ।
কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক ও সংগঠনিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করে সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। এই প্রবণতা বাহ্যিকভাবে ছোট মনে হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি।
তৃণমূলের হতাশার জন্ম
যখন একজন কর্মী বছরের পর বছর সংগঠনের জন্য কাজ করে, মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেয়, নির্যাতন-নিপীড়নের ঝুঁকি নেয়, অথচ শেষ পর্যন্ত দেখে—সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা পদে স্থান পায় এমন কেউ, যে সংকটের সময় পাশে ছিল না—তখন স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়।
এই হতাশা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষোভে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে পুরো তৃণমূল কাঠামোতে ছড়িয়ে পড়ে। কর্মীরা ভাবতে শুরু করে, “ত্যাগের কোনো মূল্য নেই।”
মনোবল দুর্বল হয়ে পড়া
একটি সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার কর্মীদের মনোবল। এই মনোবল ভেঙে গেলে সংগঠন কাগজে-কলমে যত শক্তিশালীই দেখাক, বাস্তবে তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সুবিধাবাদীরা সাধারণত মাঠের বাস্তব সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকে না। তারা সম্পর্ক, সুযোগ ও অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে উপরে উঠে যায়। ফলে প্রকৃত কর্মীরা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ
একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। তরুণ কর্মীরা যখন দেখে যে ত্যাগের কোনো স্বীকৃতি নেই, বরং সুবিধাবাদই সফলতার চাবিকাঠি, তখন তারা সংগঠনে ঝুঁকি নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
ফলাফল হিসেবে সংগঠন ভবিষ্যতের জন্য নেতৃত্বশূন্যতার সংকটে পড়ে। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
সংগঠনের ভিত দুর্বল হওয়া
যেকোনো সংগঠনের শক্ত ভিত তৈরি হয় বিশ্বাস, ন্যায়বিচার এবং মূল্যায়নের ওপর। যখন এই তিনটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সংগঠনের কাঠামো বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান থাকলেও ভিতরে ভিতরে তা দুর্বল হতে শুরু করে।
সুবিধাবাদী সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে। যোগ্যতার বদলে সম্পর্ক, ত্যাগের বদলে স্বার্থ—এই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হলে সংগঠন তার আদর্শিক ভিত্তি হারায়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা।
ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে দায়িত্ব প্রদান সুবিধাবাদ ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে হলে ত্যাগকে সম্মান দিতে হবে, এবং ত্যাগীদের পাশে দাঁড়াতে হবে—এটাই বাস্তবতা।
একটি সংগঠন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকে। ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করে কোনো সংগঠন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। সুবিধাবাদের অগ্রাধিকার হয়তো সাময়িক সাফল্য দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সংগঠনের ভিতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
তাই এখনই সময়—ত্যাগ, সততা ও নিষ্ঠাকে আবারও সংগঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।
— এম. মোস্তফা লিমন
সম্পাদক, তৃতীয়বাংলা
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন