-নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল ,সহকারী সম্পাদক ,তৃতীয় বাংলা
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ ১৬:২০
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যখন অস্থিরতা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ডালপালা মেলছে, ঠিক তখনই ব্রিটেনের শিল্প ও প্রযুক্ত খাতে এক বড়সড় আশার আলো দেখা গেল। সম্প্রতি সমাপ্ত জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন। ফ্রান্স ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে যুক্তরাজ্যে আসতে চলেছে প্রায় ১৩০ কোটি পাউন্ডের (১.৩ বিলিয়ন) এক বিশাল বিনিয়োগ। আর এই বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান সুফল পেতে যাচ্ছে মধ্য ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরী বার্মিংহাম।
এই বৃহৎ বিনিয়োগের ফলে দেশটির বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার এবং লিডস শহরে পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন শক্তি (Clean Energy) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে অন্তত ১,৪০০ উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিনিয়োগের খতিয়ান ও খাতের বিন্যাস:
খবরের ভেতরের খবর হলো, এই বিনিয়োগের সিংহভাগই আসছে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে কেন্দ্র করে।
১. ফ্রান্সের অংশীদারিত্ব: ফরাসি প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম ‘ইনফ্রাভিয়া’ (InfraVia) একাই বিনিয়োগ করছে ১০০ কোটি পাউন্ড। এই অর্থ ব্যয় হবে অত্যাধুনিক ব্যাটারি স্টোরেজ এবং একটি নমনীয় জ্বালানি প্ল্যাটফর্ম (flexible energy platform) তৈরিতে। নবায়নযোগ্য বা গ্রিন এনার্জির সরবরাহ যখন কম থাকবে, তখন এই প্ল্যাটফর্মটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করবে।
২. ভারতের অবদান:ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট ‘হেক্সাওয়্যার টেকনোলজিস’ (Hexaware Technologies) নিয়ে আসছে ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের নতুন প্রকল্প।
৩. আট্রি এনার্জি ট্রানজিশন:এছাড়া ‘আট্রি এনার্জি ট্রানজিশন’ (Atri Energy Transition) নামক প্রতিষ্ঠানটি বড় আকারের ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য আরও ৩০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও ভূ-রাজনীতি:
জি-৭ সম্মেলনের সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, " বর্তমান পৃথিবী বিগত এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও অস্থির সময় পার করছে। বিদেশের যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আঁচ এসে পড়ছে আমাদের দেশের বুকেও। আর এই কারণেই আমি যুক্তরাজ্যকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যাতে বিশ্ব বিনিয়োগকারীরা এখানে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা পান।"
তিনি আরও যোগ করেন, এই বিনিয়োগগুলো হাজার হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ব্রিটিশ উদ্ভাবনী শক্তিকে অনুপ্রাণিত করবে এবং জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থাকে মজবুত করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা বা বাহ্যিক ধাক্কা থেকে সাধারণ ব্রিটিশ পরিবারগুলো সুরক্ষিত থাকবে।
বার্মিংহামের জন্য এর গুরুত্ব:
আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে যদি এই ঘটনাকে মূল্যায়ন করি, তবে এটি স্পষ্ট যে বার্মিংহামের অর্থনীতিতে এটি একটি বড় ধরনের বুস্টার ডোজ। ঐতিহ্যগতভাবে বার্মিংহামকে বলা হতো ‘হাজার ব্যবসার শহর’ (City of a Thousand Trades)। ভারী শিল্প ও উৎপাদন খাত থেকে শহরটি যখন ধীরে ধীরে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দিকে মোড় নিচ্ছে, তখন এই এআই (AI) এবং ক্লিন এনার্জির কর্মসংস্থান স্থানীয় তরুণ ও বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
একদিকে বিশ্বজুড়ে যখন মূল্যস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির (Cost of Living) চাপ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বা লোহিত সাগরের বাণিজ্য রুটের অস্থিরতা কমাতে জি-৭ নেতাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে—তারই মধ্যে ব্রিটেনের এই বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগ প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে কিয়ার স্টারমার সরকারের জন্য এক বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাফল্য। এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ কত দ্রুত বার্মিংহামের মাটিতে বাস্তব রূপ নেয় এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানে গতি আনে।
যুক্তরাজ্য থেকে আরো পড়ুন