প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ ০৩:৫৬
সাইন্স ফিকশন মুভিতে আমরা এক সময় দেখতাম ড্রাইভারলেস কার, ফ্লাইং কারে চড়ে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিমিষেই চলে যাচ্ছে এবং সেগুলো মনে হতো এক ধরনের পরবাস্তব স্বপ্ন। কিন্তু বর্তমানে সান ফ্রান্সিসকো কিংবা দুবাইয়ের রাস্তায় চালকহীন টেক্সি চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানো বা একটিমাত্র প্রম্পটে জটিল কোডিং, মার্কেটিং কন্টেন্ট কিংবা আইনি নথির খসড়া তৈরি—এগুলোই বাস্তবতা কারন আমরা সাইন্স ফিকশনের সেই ভবিষ্যতেই বাস করছি।
এই ১৫ বছর আগেও সুপারমার্কেটগুলোতে যখন সেল্ফ চেকআউট ইন্ট্রোডিউস করা হয় তখন অনেকে ভালো চোখে নেয়নি এবং মানুষের জব চলে যাবে বলে এক ধরনের সুর উঠে কিন্তু বর্তমানে শুধু সেল্ফ চেকআউট নয় মানুষ্যবিহীন সুপার মার্কেটও বড় বড় মেগাসিটিগুলোর ব্যস্ত মানুষজন সাদরে গ্রহন করে নিয়েছে। কভিডের সময় আমরা দেখেছি ইউএস ইউকে'র অনেক শহরেই রোবট ব্যবহার করে ফুড ও গ্রোসারি পন্য ডেলিভার করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় এই রোবটগুলো এখনও রয়ে গেছে। বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের ওয়ারহাউসে রবোটিক্সের ব্যবহার অনেক আগেই শুরু করেছিল এখন তো সেটা ৯০% নিয়ে গেছে, পয়সা বাচাচ্ছে বলে কর্মী ছাটাই নিয়েও তারা তেমন চিন্তা করছে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ কনফারেন্সে জন ম্যাককার্থির হাত ধরে, যদিও সেটি দীর্ঘদিন থিওরিটিক্যাল রিসার্চের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সময়ে কম্পিউটারের প্রসেসিং পাওয়ার ও বিগ ডাটার ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের পথ ধরে মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিংয়ের বিকাশ ঘটে এবং অবশেষে ২০২২ সালে ওপেনএআই-এর 'ChatGPT' প্রকাশের মাধ্যমে জেনারেটিভ এআই সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়, যা রাতারাতি বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করে।
এআই, ফিউচারেস্টিক রোবোটিকস এবং অটোমেশনের এই পাগলা গতিতে বিশ্ব যখন নতুন এক প্রযুক্তিনির্ভর যুগের সূচনা দেখছে, নেপথ্যে তখন জমে উঠছিলো বিশাল এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা - মানুষ কি তবে খুব শীগ্রই তার পেশাগত প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ, পলিসি রিপোর্ট এবং গ্লোবাল ইকোনমিক্স এনালিসিস ঘাটলে দেখা যায়, প্রযুক্তি এবং কাজের কাঠামোগত রূপান্তর কেবল পেশাগত পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের মূল "জীবিকা" এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর এক সরাসরি প্রভাব ফে
ফেলবে - যাকে একপ্রকার অনিবার্য বলেই ধরা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চিত্র:
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অটোমেশন এবং এআই-এর কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯২ লাখ (৯ মিলিয়ন ২০০ হাজার) প্রথাগত চাকরি বিলুপ্ত বা পরিবর্তিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs)-এর মতে, জেনারেটিভ এআই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) পূর্ণকালীন চাকরি স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড করে দিতে পারে, যা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
যুক্তরাজ্য সরকারের 'এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট'-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে (DSIT report, 2026) উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মী এমন সব পেশায় নিয়োজিত আছেন যা এআই দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা খাতগুলো:
প্রযুক্তির এই বিবর্তন মূলত তিন ধরনের পেশায় মারাত্মক রূপান্তর আনছে:
১. পরিবহন ও লজিস্টিকস: ড্রাইভারলেস রাইড-শেয়ারিং ও স্বয়ংক্রিয় পণ্য পরিবহন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ট্যাক্সি, ট্রাক ও ডেলিভারি চালকের জীবিকাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
২. বুদ্ধিবৃত্তিক ও হোয়াইট-কলার পেশা: অতীতে অটোমেশন কেবল কারখানার কায়িক শ্রমকে প্রভাবিত করত। কিন্তু জেনারেটিভ এআই আসার পর কাস্টমার সার্ভিস, জুনিয়র লিগ্যাল রিসার্চ, প্রাথমিক লেভেলের কোডিং, কনটেন্ট রাইটিং এমনকি ডেটা অ্যানালিসিসের মতো মেধাভিত্তিক কাজগুলোও এআই তুলনামূলক অনেক কম খরচে সম্পন্ন করছে।
৩. এন্ট্রি-লেভেল ও শিক্ষানবিশ পদ: বিশ্বজুড়ে তরুণদের জন্য চাকরির বাজারে ঢোকার পথ সংকীর্ণ হচ্ছে কারন ফ্রেশ গ্রাজুয়েটদের কে শিক্ষানবিশ ও এন্ট্রি লেভেল জবের জন্য বেশি বিবেচনা করা হতো।
নতুন সংকট: 'চাকরি' বনাম 'জীবিকা'
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে যে রি-স্কিলিং বা 'নতুন দক্ষতা শেখানো'র কথা বলা হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ ধীরগতির। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংকটটি শুধু চাকরি হারানো (jobs crisis) নিয়ে নয়, সংকটটি আসলে মানুষের 'জীবিকা' (livelihood crisis) এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন বা অস্তিত্ব (Dignified Existence) রক্ষা করার।
ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলার জন্য প্রযুক্তির এই বিবর্তনকে থামানো সম্ভব নয়, আর এটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করাও আত্মঘাতী। বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রয়েছে—যার মধ্যে প্রধান হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কর্মী প্রতিস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ছাঁটাই না করে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে এআই ব্যবহার করেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে অধিক লাভজনক ও উদ্ভাবনী হয়ে উঠেছে।
দক্ষতা বৃদ্ধি (Upskilling) ও নতুন দক্ষতা অর্জনে (Reskilling) বিনিয়োগ:
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর ৩৯ শতাংশ দক্ষতা অপ্রাসঙ্গিক বা অকার্যকর হয়ে পড়বে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই উন্নত হোক না কেন—সৃজনশীলতা, জটিল নৈতিক সিদ্ধান্ত, অনুভূতি এবং মানবিক যোগাযোগের জায়গায় মানুষ এখনো অপরিহার্য এবং এআই দিয়ে কোনোভাবেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতাটি মূলত "মানুষ বনাম এআই"-এর লড়াই নয়। বরং কৌতূহলজনক বিষয় হলো, আসল প্রতিযোগিতাটি হবে তাদের মধ্যে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে জানেন এবং যারা জানেন না। বিশ্বের সরকারগুলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট খাত যদি সমন্বিতভাবে উদ্যোগ না নেয়, তবে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব এক বিশাল সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে একযোগে কাজ করলে আমরা এটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব।
হোসেন আহমদ মাসুম
এডিটর : তথ্য -প্রযুক্তি বিভাগ, তৃতীয়বাংলা
লন্ডন, ইউকে
২৪শে জুলাই, ২০২৬
তথ্য প্রযুক্তি থেকে আরো পড়ুন