বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্ক কূটনীতির বাইরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সমরশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মতো বহুমুখী খাতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদ্বারত্বে রূপ নিচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৩০ থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা ও ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।
শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এসব কথা বলেন।
তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা আসেন হাকান ফিদান। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে হাকান ফিদান বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারে আগ্রহের কথা জানান। তিনি বলেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা আমরা পর্যালোচনা করেছি।
হাকান ফিদান বলেন, বাংলাদেশের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া নতুন যুগের বৈশ্বিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এই ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের সম্মানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা এবং খলিলুর রহমান অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফল হবেন।
তিনি বলেন, খলিলুর রহমান বিশ্ব শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি রক্ষা ও অগ্রগতির লক্ষ্যে পরিচালিত প্রচেষ্টায় ব্যাপকভাবে অবদান রাখবেন– এ বিষয়ে আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। তুরস্কের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের প্রিয় ভাইকে আগের মতোই জোরালোভাবে সমর্থন করে যাব।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। আমরা এতে অত্যন্ত আনন্দিত।
তিনি বলেন, আজকের বৈঠকে আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আমাদের সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে বিস্তৃত পরিসরে আরও গভীর এবং এটিকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তি ও দূরদর্শী মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।
হাকান ফিদান বলেন, আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জন্য করণীয় নিয়েও আলোচনা করেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে আমাদের সহযোগিতা বিকাশের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। আমরা বিষয়গুলো একে একে পর্যালোচনা করেছি।
তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে একটি সমঝোতাস্মারক সই করেছি। আমি আশা করি, মানবতার অভিন্ন ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আমাদের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হিসেবে এই দলিলটি উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী দেশ, যার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি বিস্তৃত সহযোগিতা নেটওয়ার্ক রয়েছে। এটি বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বৈঠকে আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে আমাদের অভিন্ন অবস্থান এবং সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছি। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে বাংলাদেশ তার কাঁধে এক বিশাল মানবিক দায়িত্ব বহন করছে। দুর্ভাগ্যবশত রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। মানবতার পক্ষ থেকে এক ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ প্রদর্শন করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ, সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংহতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছি। আমরা এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচ্যসূচিতে রাখতে নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ককে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। এ লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর ছিল তুরস্ক। সে সময় আমাদের চমৎকার বৈঠক হয়।
তিনি বলেন, আমরা তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানাই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এটি দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা, সমন্বয় এবং বোঝাপড়াকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করবে।
খলিলুর রহমান বলেন, আমি তুরস্ক সরকারকে, বিশেষ করে আপনাকে (হাকান ফিদান), জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি অমূল্য সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি। বাংলাদেশে আপনাকে অভ্যর্থনা জানানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনার কাছ থেকে যে সমর্থন, উৎসাহ এবং সহায়তা পেয়েছি, তা আমি কখনো ভুলব না।
তিনি বলেন, উভয় দেশের জনগণের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, যৌথ সমৃদ্ধি এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক বিষয়ে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ। হাকান ফিদানের এই সফর দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে ও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে ভূমকা রাখবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা তুরস্কের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আমি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা সম্পর্কে অবহিত করেছি এবং সম্ভাব্য তুর্কি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমরা বাংলাদেশে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তুরস্ককে দিয়েছি। আমরা শিল্প অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করেছি।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসইভাবে মিয়ানমারের নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা চেয়েছি।
সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় সমঝোতাস্মারক সই
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সহযোগিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে একটি সমঝোতাস্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশের পক্ষে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং তুরস্কের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সমঝোতাস্মারকে সই করেন।
এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ছাড়াও উভয় দেশের সংস্কৃতি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানায়, ১৯৮১ সালের সাংস্কৃতিক চুক্তি এবং ২০১২ সালের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিল্প, প্রেস ও তথ্য, যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সহযোগিতা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় নতুন এই সমঝোতাস্মারক সই হলো। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রত্নসম্পদ রক্ষা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, মহাফেজখানার নথি ও গ্রন্থাগার সামগ্রী সংরক্ষণ, ডিজিটাইজেশন এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হলো।
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন