বিকেল পৌনে পাঁচটা। সাদেক সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাতের সস্তা ঘড়িটার দিকে তিনি তাকাচ্ছেন আর বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা বাড়ছে। আর মাত্র পনেরো মিনিট। এই পনেরো মিনিটের মধ্যে যদি তিনি ২৮ তলার এই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে না পারেন, তবে মতিঝিলের লাস্ট বাসটা ছেড়ে দেবে। বাস মিস হওয়া মানে এই তীব্র গরমে, জ্যামের ঢাকায় এক মহাবিপর্যয়।
কিন্তু বিপর্যয়টা আসলে ওপরের ফ্লোরে নয়, লুকিয়ে আছে নিচে।
লিফটের সামনে যেতেই সাদেক সাহেবের কলিজা শুকিয়ে গেল। লোকজনের এলাহী কাণ্ড! মানুষে মানুষে থিকথিক করছে চারপাশ। সবাই মরিয়া হয়ে নিচে নামতে চায়। বাস ধরার তাড়া, ঘরে ফেরার তাড়া। সাদেক সাহেব নিতান্তই ছোটখাটো এবং লাজুক প্রকৃতির মানুষ, এই কনুইয়ের গুঁতোগুঁতির বাজারে তিনি বড়ই বেমানান। তবুও বাস ধরার তাড়ায় চোখ বুজে ভিড় ঠেলে কোনোমতে 'বি' চিহ্নের লিফটের এক কোণায় একটু জায়গা পেলেন। ইস্পাতের ভারী দরজাটা যখন বন্ধ হলো, তখনই ওনার কেমন যেন দমবন্ধ লাগছে। মানুষের শরীরের ওম, ঘামের গন্ধে ভেতরের বাতাস এখনই ভারী। গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে!
লিফট নামতে শুরু করল। ২৮, ২৭, ২৬... ঠিক তেরো তলায় আসতেই একটা বিকট ধাতব শব্দ হল'খটাং!'
এবং সাথে সাথে এক আতংক। লাইট, ফ্যান সব এক নিমেষে হাওয়া। ঘুটঘুটে অন্ধকার। লিফটটা মাঝপথে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। সবাই তখন হাতের মোবাইলের টর্চ ধরাতে ব্যস্ত। আলো জ্বলছে। ইমার্জেন্সি সুইচে কল দেয়া হয়েছে। কোন খোঁজ খবর নাই। টর্চের আলোয় সকলের মুখে উদ্বেগের রেশ দেখা যাচ্ছে।
পাঁচ মিনিট গেল, দশ মিনিট গেল, দেখতে দেখতে পনেরো মিনিট পার হয়ে গেল। এক মিনিট সমান এক বছর লাগছে!
লিফটের ভেতরটা এখন আর লিফট নেই, একটা জীবন্ত কফিন হয়ে গেছে। সাদেক সাহেবের পুরনো শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। এই বদ্ধ, বাতাসহীন খাঁচায় ওনার ফুসফুসটা যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসছে। চোখের সামনে ঘন অন্ধকার। হার্টবিট এত বাড়ছে যে মনে হচ্ছে বুকের পাঁজরটা এখনই ফেটে যাবে। ঠিক তখনই একটা ভয়ানক কাণ্ড ঘটল। পুরো লিফটটা তাসের ঘরের মতো কেঁপে উঠল এবং চোখের সামনে ওপরের সিলিংয়ের একটা লোহার পাত খটখট করে খুলে খসে পড়ল মেঝেতে। সাদেক সাহেব চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ওনার মনে হলো শেষ! জীবনটা বুঝি এই সামান্য একটা লোহার বাক্সে শেষ হয়ে গেল। ওনার মুখ দিয়ে শুধু বেরুলো, " ও আল্লাহ গো ও ও..."
-কী গো, এই সাত সকালে এত ডাকছ কেন?
সাদেক সাহেব ধড়ফড় করতে করতে উঠে বসলেন। দু হাত দিয়ে চোখ কচলাচ্ছেন যেন চোখের মধ্যে কিছু পড়েছে কিংবা তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। সামনে ওনার স্ত্রী রুবি দাঁড়িয়ে, হাতে পানির গ্লাস।
-"খারাপ স্বপ্ন দেখছ নাকি! সকালবেলা ফজরের নামাজে ডাকলাম কত ,উঠলাই না! নামাজ না পড়লে শয়তানে কানে প্রস্রাব করে দেয়! তোমারও দিছে কথাটা বলে হো হো করে হাসতে থাকে! "
রুবির এই হাসি দেখে সাদেক সাহেবের ইচ্ছে করে বউটাকে একটা থাপ্পড় দিতে। আগের মত অভ্যাস থাকলে হয়তো দিয়ে বসতো ,এখন যেহেতু একটু বদলানোর চেষ্টা করছে তাই কিছু আর বলে না। সাদেক সাহেবের নিজেকে অসহায় লাগে! তিনি বাহিরের দিকে তাকিয়ে দেখেন জানালা দিয়ে ভোরের নরম আলো আসছে। মাথার ওপর টেবিল ফ্যানটা চেনা শব্দে ঘড়ঘড় করে ঘুরছে।
তিনি এবার বুক ভরে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিলেন। ফুসফুসটা বাতাসে ভরে গেল। যাক, উনি বেঁচে আছেন! ওটা আসলে একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন বলতে নিষেধ তাই তিনি আর রুবিকে কিছু জানালেন না।
অফিসে জরুরি কাজ না থাকলে আজ হয়ত তিনি ছুটি নিতেন। কিন্তু যেতেই হবে। ডাল ভাতের এই রিজিকের সাথে অবহেলা করা চলে না। আর কিছু সময় পরই অফিসের জন্য রওনা হতে হবে। আবার সেই ২৮ তলার বিল্ডিং, আবার সেই লিফটের যুদ্ধ।
সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট।
সাদেক সাহেব অফিসের লবিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ১০টা বাজতে ঠিক এক মিনিট বাকি। এখন যদি লিফটে না ওঠেন, তবে লেট কাউন্ট হবে। অথচ লিফটের সামনে এসে ওনার পা দুটো অবশ হয়ে গেছে।
উনি 'বি' নং লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গতকালই এক অরনেট মেয়ে ওনাকে সাবধান করে বলেছিল, " সাদেক স্যার , বি নং লিফটে সমস্যা আছে, ওটায় ওঠেন না।" কিন্তু কপাল খারাপ, আজ উনি লিফটে কল দিতেই 'বি' লেখা বাতিটা জ্বলে উঠেছে। দরজাটা হা করে খুলে গেছে ওনার সামনে।
সাদেক সাহেব ঘড়ির দিকে তাকালেন, তারপর লিফটের বোতামের দিকে। ২৮ প্রেস করলেন। স্ক্রিনে 'বি' দেখাচ্ছে। সময় নেই। উনি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিফটে পা দিয়ে উঠে পড়লেন।
ভেতরে ঢোকার পর থেকেই বার বার রাতের স্বপ্নটা ওনার চোখের সামনে ভাসছে। তিনি ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছিলেন কিছু মানুষের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। মুমিনের নবুয়্যতের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ হলো সত্য স্বপ্ন। সাদেক সাহেব জানেন তিনি আহামরি কোনো বুজুর্গ ব্যক্তি নন; অতি সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু কীভাবে যেন সেই অলৌকিক কাণ্ডটাই ঘটে গেল!
ঠিক তেরো তলায় আসতেই একটা বিকট শব্দ হলো-'খটাং!'
সব আলো নিভে গেল। ফ্যানটা বন্ধ হয়ে গেল। লিফটে আটকা পড়ে গেছেন সাদেক সাহেবসহ আরও অনেকেই। চারপাশ অন্ধকার।
সাদেক সাহেব কাঁপছেন। অন্ধকারের মধ্যে দেয়ালটা হাতড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। চারিদিকের ঘামের উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগছে। ওনার মাথায় এখন আর বাসের চিন্তা নেই, শ্বাসকষ্টের ভয়ও নেই। ওনার মগজের ভেতর তীব্র একটা বিভ্রম তৈরি হয়েছে। উনি স্তব্ধ হয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন কোনটা আসলে সত্যি? স্বপ্নের মধ্যে সত্যি দেখেছেন নাকি বাস্তবটা-ই স্বপ্ন! সবকিছু কেমন যেন ঘোরময় লাগছে! সাদেক সাহেব চোখ খুলে দেখেন তাকে ঘিরে অনেকগুলো মাথা। আর কে যেন বলছে উনার প্রেশার অনেক হাই-প্রেশার কমাতে হবে! মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে!
রুবাইদা গুলশান
গল্পকার | সাহিত্যিক | কলামিস্ট
শিল্প সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন