প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ ০১:৪৮
তৃতীয়বাংলা ডেস্ক :মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যুদ্ধের চেয়ে অনেক সময় প্রতীকই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফা সামরিক হামলা সেই প্রতীকী রাজনীতিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ ও ফার্স নিউজ জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বান্দার আব্বাস, সিরিক এবং আশপাশের এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে তেহরান একে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করছে।
প্রশ্ন হলো, খামেনির জানাজার পরপরই এই হামলা কেন?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা হয় Strategic Signalling অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে শুধু সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবেও একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া। এই বার্তার অর্থ হতে পারে, নেতৃত্বের পরিবর্তন, জাতীয় শোক কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে না।
তবে ইতিহাস বলে, এমন কৌশল সব সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না।
ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি সামরিক হামলা প্রায়ই জাতীয়তাবাদী আবেগকে আরও শক্তিশালী করেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাইরের হামলার মুখে জনগণ অনেক সময় রাষ্ট্রের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। ফলে যে হামলার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, সেটিই কখনো কখনো তাদের অভ্যন্তরীণ সংহতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘ সনদের Article 2(4) অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। তবে Article 51 অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র সশস্ত্র হামলার শিকার হলে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
কিন্তু সেই আত্মরক্ষারও সীমা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন দুটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করে Necessity (প্রয়োজনীয়তা) এবং Proportionality (সমানুপাতিকতা)। অর্থাৎ আত্মরক্ষার নামে যে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে, তা অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং হামলার তুলনায় সমানুপাতিক হতে হবে। অন্যথায় সেই পদক্ষেপও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইরান যদি দাবি করে যে এই হামলা তাদের সার্বভৌমত্বের অবৈধ লঙ্ঘন, তবে আন্তর্জাতিক আদালত বা কূটনৈতিক ফোরামে সেই দাবিও একই আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে।
এই সংঘাতের আরেকটি বড় মাত্রা রয়েছে-হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও এর প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন আইনবিদ হিসেবে আমি মনে করি, এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামরিক নয়, আইনি।
আন্তর্জাতিক আইন কি এখনও রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে আইনের পরিবর্তে শক্তির ভাষাকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে?
খামেনির জানাজার পরপরই হামলা হয়তো সামরিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু ইতিহাস একে শুধু একটি সামরিক অভিযান হিসেবে মনে রাখবে না। এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে এমন এক প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে, যখন শোকের আবহ কাটতে না কাটতেই আবার যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল।
ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয়-যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, তা কোনো পক্ষই নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।
লেখক:
নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
সহকারী সম্পাদক তৃতীয় বাংলা
আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন