লেখক: বেলাল আহমদ
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী আমাদের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে নদী কখনো কখনো মানুষের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী সিলেটের কানাইঘাট উপজেলা প্রতিবছরই উজানের ঢল, বন্যা ও নদীভাঙনের হুমকির মুখোমুখি হয়। ভারতের আসাম ও মেঘালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলেই সুরমা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়, আর সেই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে কানাইঘাটের জনজীবনে।
অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগ কখনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ কিংবা উজান থেকে নেমে আসা প্রবল ঢল মুহূর্তেই হাজারো মানুষকে পানিবন্দি করে ফেলতে পারে। কৃষকের সারা বছরের কষ্টে ফলানো ফসল নষ্ট হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে, গ্রামীণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অসংখ্য পরিবার নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটায়। প্রতিবারই মানুষ ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্নটি বারবার আড়ালে থেকে যায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে উত্তম। বন্যার পরে ত্রাণ বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত কিংবা পুনর্বাসনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক বেশি কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক। তাই সুরমা নদীর তীররক্ষা বাঁধের দুর্বল অংশগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে টেকসইভাবে সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে জিওব্যাগ, বালুর বস্তা এবং আধুনিক নদীশাসন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে সুরক্ষিত করতে হবে।
একটি বিষয় আমাদের উপলব্ধি করা জরুরি—বন্যা একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হতে পারে, কিন্তু অব্যবস্থাপনা কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়। যথাসময়ে পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
কানাইঘাটের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তারা চান নিরাপদ জীবন, টেকসই অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের ন্যায্য অধিকার। একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ শুধু নদীভাঙন রোধ করবে না, এটি কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকেও সুরক্ষা দেবে। এটি হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান—সম্ভাব্য দুর্যোগের আগেই সুরমা নদীর তীররক্ষা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো জরুরি ভিত্তিতে পরিদর্শন, সংস্কার ও শক্তিশালী করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কানাইঘাটকে বন্যা ও নদীভাঙনের স্থায়ী ঝুঁকি থেকে রক্ষার উদ্যোগ নিন।
আসুন, আমরা সবাই দল-মত নির্বিশেষে একটি নিরাপদ, টেকসই ও দুর্যোগ-সহনশীল কানাইঘাট গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হই। কারণ মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
আমাদের দাবি একটাই—
"সুরমা নদীর তীরে টেকসই বাঁধ চাই, নিরাপদ ও দুর্যোগমুক্ত কানাইঘাট চাই।"
লেখক:
বেলাল আহমদ
সমাজকর্মী ও চেয়ারম্যান
ইমেজ ফাউন্ডেশন, কানাইঘাট, সিলেট
সিলেট থেকে আরো পড়ুন