খেলাধুলা

ফাইনালে ‘ভিলেন’ আর্জেন্টিনা, স্বপ্নভঙ্গ মেসির

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ ১২:১১

খেলাধুলার সবচেয়ে বড় মঞ্চে শেষবারের মতো খেলতে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। এ বিশ্বকাপ ফাইনালে তিনি যে শেষবারের মতো আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিতে যাচ্ছেন, তা একরকম নিশ্চিতই মনে হচ্ছিল।

তবে রোববার নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামের পশ্চিম গ্যালারির পেছনে সূর্য যখন হেলে পড়ল, তখন একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করল—পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা যে জাদুকরী ফুটবল খেলেছে, তা তারা হারিয়ে ফেলেছে। আর স্পেন যখন ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছিল, তখন রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। মেসি এবং আর্জেন্টিনার সময় অবশেষে ফুরিয়ে এসেছে। নিজেদের সবচেয়ে বাজে প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে ১-০ ব্যবধানের পরাজয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাদের।

টুর্নামেন্টের অন্য প্রতিটি ম্যাচে আমরা যে আর্জেন্টিনা এবং মেসিকে দেখেছি, এই ফাইনালে দেখা গেল তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। বলতে গেলে প্রায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই, লা আলবিসেলেস্তেরা ছিল এ টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিনোদনদায়ী দল। তারা কীভাবে গোল করেছে তার চেয়ে কখন গোল করেছে, সেটাই ছিল বেশি আকর্ষণীয়—যা নাটকীয় টাইমিংয়ের এক দুর্দান্ত মাস্টারক্লাস উপহার দিয়েছে। দুবার তারা তুলনামূলক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে প্রায় বিদায় নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু সেই ফলাফলগুলো তাদের আরও বেশি উজ্জীবিতই করেছে।

শেষ হলো মেসির সময়

তবুও এখন আমাদের সেই অমোঘ বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হচ্ছে যে, মেসির দিন শেষ—অন্তত বিশ্বকাপের মঞ্চে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে প্রায় চার দশক পর আর্জেন্টিনাকে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতানোর পরও এমনটা বলা হয়েছিল। এমনকি ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পর মেসি যখন জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসর নিয়েছিলেন, তখনও এমনটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল। তখন এই খেলোয়াড়কে নিয়ে আলোচনা ছিল যে, তিনি বার্সেলোনার হয়ে যেভাবে খেলেন, আর্জেন্টিনার হয়ে কখনোই সেভাবে খেলতে পারবেন না। এমনকি এমন গুঞ্জনও ছিল যে, জীবনের অনেকটা সময় স্পেনে কাটানোর কারণে মেসি হয়তো পুরোপুরি আর্জেন্টাইনই নন। ১০ বছর পর আজ এ দুটি যুক্তিই হাস্যকর বলে মনে হয়।

হতাশার ফাইনাল ও স্পেনের দাপট

ফাইনাল ম্যাচগুলো প্রায়শই ভুলে যাওয়ার মতো হয়, যা দর্শকদের বিনোদন দিতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু সেই নিম্নমানের মানদণ্ডেও এই ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ছিল ভীষণ হতাশাজনক। স্পেনের রক্ষণভাগ ছিল দমবন্ধ করা। ভুলে যাওয়ার মতো একটি প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধের ৪৫ মিনিটে তারা অবশেষে নিজেদের গুছিয়ে নেয় এবং প্রত্যাশামতোই অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে গোলের দেখা পায়। আর আর্জেন্টিনা? টুর্নামেন্টের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে তারা প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের নির্ধারিত সময়ে কোনো শট নিতে ব্যর্থ হওয়ার লজ্জার রেকর্ড গড়েছে। এমনকি অতিরিক্ত আধা ঘণ্টা সময় পেয়েও তারা কখনোই প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেনি।

আর মেসি? এই ফাইনালের আগপর্যন্ত, পেশাদার খেলায় তিনি দর্শকদের সামনে অন্যতম বিরল এক সুযোগ এনে দিয়েছিলেন, কোনো রকম ঝুঁকি বা পারফর্ম করার সত্যিকারের চাপ ছাড়াই শ্রেষ্ঠত্ব চাক্ষুষ করার সুযোগ। ৩৯ বছর বয়সে এসে মেসি তার সময় পার করে এসেছেন এবং ব্যক্তি, ক্লাব বা দেশের হয়ে তার জেতা ট্রফির ভাণ্ডার নিয়ে কেউ কোনো সমালোচনা করতে পারবে না। এ পরাজয় তার দাগহীন কিংবদন্তি ক্যারিয়ারে কোনো কালিমা লেপন করবে না; জয়টা কেবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তার দাবিকে আরও জোরালো করত। কিছু আর্জেন্টাইনের কাছে হয়তো সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টি ফাইনাল জয়ের মতোই সমান তাৎপর্য বহন করে।

নিষ্প্রভ মেসি, দিশেহারা আর্জেন্টিনা

তবুও বলতেই হবে- এ ম্যাচে মেসির উপস্থিতি খুব কমই চোখে পড়েছে। এ গ্রীষ্মে মাঝেমধ্যেই যিনি দলকে একা টেনেছেন, তার সঙ্গে এ ম্যাচের মেসির কোনো মিলই ছিল না। এর বড় কারণ অবশ্যই রক্ষণে স্পেনের মাস্টারক্লাস পারফরম্যান্স। তবে শুধু এটিই সব সময় আর্জেন্টিনার এই খুদে জাদুকরকে আটকে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু স্পেনকে তাদের প্রাপ্য কৃতিত্ব দিতেই হবে, তারা সব দিক দিয়েই আর্জেন্টিনাকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে, এমনকি মেসিকেও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ম্যাচের শেষ ভাগে এসে আর্জেন্টিনা ঠিক সেরকম একটি দলে পরিণত হয়েছিল, অনেকেই শুরু থেকে যেমনটা ভেবেছিলেন (যা হয়তো কিছুটা অন্যায় ছিল)- হীন, নোংরা এবং মরিয়া এক দল।

মাঠে মেসির কাছে সময় প্রায় সব সময়ই অপ্রাসঙ্গিক, কারণ ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিতে তিনি খুব সহজেই সময়কে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁকিয়ে নিতে পারেন। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি যেভাবে খেলেন, তা অনেকটা একই রকম প্রভাব ফেলে। এটি যেন সময়ের মধ্যে এক ফাটল ধরিয়ে দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বার্সেলোনা বা অন্য কোথাও কাটানো তার সেই সোনালি দিনগুলোতে। সময় তাকে ততটা পেছনে ফেলতে পারেনি, যতটা তিনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছেন। মাঝেমধ্যে হয়তো এক-দু পা পিছিয়ে পড়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবার সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন।

স্কালোনির আক্ষেপ এবং এক করুণ সমাপ্তি

স্বদেশে আর্জেন্টিনার এ পারফরম্যান্স কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়, যেখানে প্রত্যাশার পারদ ছিল স্বভাবতই অনেক উঁচুতে। প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং এমনকি মেসিও ফাইনালের আগে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছিলেন যে তারা এরই মধ্যে কতটা অর্জন করেছেন। তাদের কথার সুর ছিল এমন যে, ফাইনালের এই ফলাফল তাদের সেই অর্জনের তৃপ্তিকে খুব একটা ম্লান করতে পারবে না।

অবশ্য, মাঠে নেমে মোটামুটি খেলাটাকে নষ্ট করে ফেলার আগেই তারা এসব কথা বলেছিলেন। মেসির মতো স্কালোনির কিংবদন্তিও এই ফাইনালের আগেই সুরক্ষিত ছিল। এই কোচ আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এবং জোড়া কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দিয়েছেন, তবে এই ফাইনালটি ছিল সেই অবস্থানকে আরও পাকাপোক্ত করার একটি হারানো সুযোগ। দুটি বিষয় একসঙ্গে অবস্থান করতে পারে- স্কালোনি প্রায় প্রশ্নাতীতভাবেই আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা কোচ, আর এই ম্যাচটি ছিল তাঁর অন্যতম বাজে ফলাফল ও পারফরম্যান্স।

তবে এ করুণ ফাইনাল পারফরম্যান্সের পর যেটা সবচেয়ে বেশি সত্যি বলে মনে হচ্ছে, তা হলো একরাশ শূন্যতা ও হতাশা। অথচ আর্জেন্টিনা এবং মেসির সামনে সুযোগ ছিল নিজেদের রূপকথায় নিখুঁত তুলির আঁচড় দেওয়ার। তার বদলে, তারা নায়ক থেকে ‘ভিলেন’-এ পরিণত হলো—আর সেটা হলো একেবারেই অকারণে।

খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন