নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল, আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০০:৩৬
ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সম্পর্কটা অনেকটা বিবাহিত দম্পতির মতো। একে অপরকে খোঁচা দেওয়া, ঠাট্টা করা, তর্কে জড়িয়ে পড়া-এসব যেন আমাদের
নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু সংসারে যেমন বিচ্ছেদ কখনো আনন্দের নয়, তেমনি বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ও একজন প্রকৃত ফুটবলপ্রেমীর জন্য আনন্দের হতে পারে না।
আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই ব্রাজিলের বিপক্ষে জিততে চাই, তাদের নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি করতে ভালো লাগে। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বীই যদি মঞ্চ ছেড়ে চলে যায়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সৌন্দর্যও অনেকটাই হারিয়ে যায়। কারণ ব্রাজিল ছাড়া বিশ্বকাপ যেন কিছুটা অসম্পূর্ণ।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম দেশই ব্রাজিলের মতো এত গভীর ছাপ রেখে গেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি শুধু শিরোপা জেতেনি, ফুটবলকে দিয়েছে শিল্পের মর্যাদা। পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা, নেইমার, ভিনি জুনিয়র-প্রতিটি প্রজন্মই বিশ্ব ফুটবলকে নতুন এক নান্দনিকতা উপহার দিয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দিয়েছে ম্যারাডোনা, বাতিস্তুতা, রিকেলমে, মেসির মতো কিংবদন্তি। এই দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় নাটক।
আসলে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া বড় জয়ের গল্পও পূর্ণতা পায় না। আর্জেন্টিনা যখন শিরোপা জেতে, তখন সেই আনন্দ আরও বেশি অর্থবহ হয় যদি ব্রাজিলও টুর্নামেন্টে শক্ত অবস্থানে থাকে। কারণ ইতিহাস গড়ার জন্য শক্তিশালী প্রতিপক্ষের প্রয়োজন হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দুই দলের সমর্থকদের খুনসুটি কখনো কখনো বিদ্বেষে রূপ নেয়। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ সমর্থকই জানেন, ব্রাজিল না থাকলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সেই চিরচেনা তর্ক, সেই উত্তেজনা, সেই আবেগ অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো ঘৃণার নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধার আরেকটি রূপ।
ফুটবল আমাদের শেখায়, কোনো দলই চিরকাল অপরাজেয় নয়। আজ ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে, আগামীকাল হয়তো আর্জেন্টিনাও বিদায় নেবে। কিন্তু এই ওঠানামার মধ্য দিয়েই ফুটবলের সৌন্দর্য বেঁচে থাকে। পরাজয়ই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়, আর প্রত্যাবর্তনের গল্পই কিংবদন্তি তৈরি করে।
তাই একজন আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে ব্রাজিলের বিদায়ে উল্লাস করার চেয়ে মন খারাপই বেশি হয়েছে। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতিই ফুটবলকে পূর্ণতা দেয়। একজনের জয় যেমন অন্যজনকে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরতে অনুপ্রাণিত করে, তেমনি একজনের বিদায় অন্যজনের আনন্দকেও কিছুটা অসম্পূর্ণ করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই খেলার প্রেমে পড়া মানুষ। জার্সির রং আলাদা হতে পারে, আবেগের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য আমাদের এক সুতোয় গেঁথে রাখে। তাই প্রতিপক্ষকে হারানোর আনন্দ আছে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফেলার আনন্দ নেই। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই।
খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন