রেজাউল ইসলাম বিল্লাহ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, তৃতীয়বাংলা , কলামিস্ট, অনলাইন একটিবিষ্ট
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ ০৩:০২
বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে—দ্বৈত নাগরিকরা কি জনপ্রতিনিধি হতে পারবেন? যদি পারেন, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন কোথায় দাঁড়ায়? আর যদি না পারেন, তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রে অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?
এই বিতর্কের সমাধান আবেগ দিয়ে নয়; সংবিধান, আইন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং জনস্বার্থের আলোকে হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয় সংশ্লিষ্ট আইন ও নির্বাচন কমিশনের বিধিমালার মাধ্যমে। একই সঙ্গে The Bangladesh Citizenship (Temporary Provisions) Order, 1972 (President’s Order No. 149 of 1972) এবং পরবর্তীকালে জারি করা দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবতা হলো, গত কয়েক দশকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিযোগ বা আলোচনা বহুবার এসেছে, যাদের বিদেশি নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কোথাও আদালতের ব্যাখ্যা এসেছে, কোথাও নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আবার কোথাও বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ বা স্থগিত করার বিষয়ও সামনে এসেছে। অর্থাৎ, বিষয়টি একরৈখিক নয়; বরং আইন, তথ্য এবং প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল।
দ্বৈত নাগরিকত্বের পক্ষে শক্তিশালী কয়েকটি যুক্তি রয়েছে।
প্রথমত, আজকের বিশ্বে নাগরিকত্বের ধারণা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করছেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, ব্যবসা করছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ যদি দেশের উন্নয়নে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাদের অংশগ্রহণকে একেবারে অস্বীকার করা সহজ নয়।
দ্বিতীয়ত, অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ দ্বৈত নাগরিকত্বকে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সসহ বহু দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব বৈধ। যদিও নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংবিধানিক ও আইনি শর্ত রয়েছে, তথাপি নাগরিকত্বের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে তারা অস্বীকার করে না।
তৃতীয়ত, বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা উন্নত প্রশাসন, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা স্থানীয় সরকার পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
তবে বিপরীত যুক্তিগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের প্রতি একক আনুগত্য। একজন জনপ্রতিনিধি শপথ নেন বাংলাদেশের সংবিধান রক্ষা করার। যদি তিনি একই সঙ্গে অন্য একটি দেশের নাগরিকও হন, তাহলে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা অনেকের।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল তথ্যের বিষয়ও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে এমন পদে, যেখানে নিরাপত্তা, ভূমি, সীমান্ত বা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণের বিষয় রয়েছে, সেখানে একাধিক রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তৃতীয়ত, স্বচ্ছতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা দ্বৈত নাগরিকত্বে নয়; সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন কোনো প্রার্থী তার বিদেশি নাগরিকত্ব বা তার অবস্থা গোপন করেন। যদি কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, অথবা আইন অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব ধারণ করে থাকেন, তবে সেটি হলফনামায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে উল্লেখ করা উচিত। গোপন তথ্য নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আইন কি ব্যক্তির নাগরিকত্বকে শাস্তি দেবে, নাকি তথ্য গোপন করাকে?
আমার মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগে। যদি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনে বা নির্দিষ্ট পদে দ্বৈত নাগরিককে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়, তাহলে শুধুমাত্র দ্বৈত নাগরিক হওয়ার কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করার যৌক্তিকতা দুর্বল। আবার যদি আইন কোনো নির্দিষ্ট পদে দ্বৈত নাগরিকত্বকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে নির্ধারণ করে, তাহলে সেই বিধান সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
অতএব, সমাধান দ্বৈত নাগরিকত্বকে কেন্দ্র করে আবেগ সৃষ্টি নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, স্পষ্ট এবং বৈষম্যহীন আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রার্থীদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্কের সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে আইন যদি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তবে সেটি সংসদীয় বিতর্ক, জনমত এবং সাংবিধানিক নীতির আলোকে হওয়া উচিত।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বায়নের যুগে দ্বৈত নাগরিকত্ব আর ব্যতিক্রম নয়; বরং অনেক দেশের বাস্তবতা। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত—কে কয়টি পাসপোর্ট ধারণ করেন, সেটি নয়; বরং তিনি বাংলাদেশের আইন মেনে চলছেন কি না, তার নাগরিকত্বের তথ্য সৎভাবে প্রকাশ করেছেন কি না, এবং জনগণের প্রতি তার জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত। গণতন্ত্রের শক্তি নাগরিকত্বের সংখ্যায় নয়, বরং আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থায় নিহিত।
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন