জাতীয়

ইউনিয়ন পরিষদকে অনুদাননির্ভর নয়, উৎপাদনমুখী করতে হবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ ০৩:৩৯

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামীণ মানুষের জন্য এই প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক ও সেবামূলক কাঠামো। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, গ্রামীণ সড়ক, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে স্থানীয় উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে একটি ইউনিয়ন পরিষদ কি শুধুই সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, নাকি নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলবে?

 

বর্তমানে অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের আয়ের প্রধান উৎস কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ। নিজস্ব আয়ের মধ্যে রয়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, হাট-বাজার ইজারা, বিভিন্ন সনদপত্রের ফি এবং সীমিত কিছু সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব। কিন্তু এসব আয় দিয়ে একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে প্রায় প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য স্থানীয় সরকারকে ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এতে একদিকে স্থানীয় উদ্যোগ সীমিত হয়, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ে।

 

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে এগোচ্ছে, তখন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার চিন্তাধারাতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। ইউনিয়ন পরিষদকে শুধু সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদনমুখী চিন্তা, সম্পদের সৃজনশীল ব্যবহার এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে আয়বর্ধক উদ্যোগ গ্রহণ।

 

একটি ইউনিয়নের অনেক সম্পদ রয়েছে, যা প্রায়ই অব্যবহৃত থাকে। খাসজমি, জলাশয়, হাট-বাজার, কৃষিজমি, স্থানীয় শ্রমশক্তি, নারীদের কর্মক্ষমতা এবং তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি—এসবই অর্থনৈতিক সম্পদ। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এগুলোকে আয়ের উৎসে পরিণত করা সম্ভব।

 

উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন প্রকল্প। ইউনিয়ন পরিষদের মালিকানাধীন বা আইনানুগ ব্যবস্থাপনাধীন জমিতে আধুনিক কৃষি, ফলের বাগান, মাছের খামার, হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলা যেতে পারে। এসব প্রকল্প স্থানীয় সমবায়, যুব উদ্যোক্তা বা নারীদের সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করেও বাজারজাত করা সম্ভব। এতে একদিকে ইউনিয়নের আয় বাড়বে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

 

একইভাবে দুগ্ধ, মাছ, মধু, সবজি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। গ্রামের কৃষকরা প্রায়ই ন্যায্য দাম পান না, কারণ তারা কাঁচামাল বিক্রি করেন। কিন্তু যদি ইউনিয়ন পর্যায়ে দুধ থেকে দই, ঘি বা পনির, ফল থেকে জ্যাম বা জুস, মাছ থেকে শুকনা বা প্যাকেটজাত পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা হয়, তাহলে একই পণ্য থেকে অনেক বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে। এতে কৃষক, উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতি—সবাই লাভবান হবে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ইউনিয়নভিত্তিক শিল্পায়নের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা যেতে পারে। গার্মেন্টস, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ কিংবা ক্ষুদ্র শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব। এতে রাজধানীমুখী কর্মসংস্থানের চাপ কমবে, নারীদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের সরাসরি বাণিজ্যিক শিল্প বা কারখানা পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত। তাই ভবিষ্যতে যদি এই ধরনের মডেল বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে আইন সংশোধন, স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP), সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ বা কমিউনিটি এন্টারপ্রাইজের মতো স্বচ্ছ অংশীদারিত্বের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ অবকাঠামো, জমি বা সহায়তা দিতে পারে; আর বেসরকারি খাত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারে। এতে স্থানীয় সরকার নিয়মিত রাজস্ব পাবে, আবার ব্যবসায়িক ঝুঁকিও সরাসরি বহন করতে হবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সরকার শুধু কর আদায় করে না; তারা শিল্পাঞ্চল, কৃষি বাজার, পর্যটন কেন্দ্র, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তুলে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সময় এসেছে স্থানীয় সরকারকে ব্যয়কারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং আয় সৃষ্টিকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের নীতিগত আলোচনা শুরু করার।

 

তবে যেকোনো অর্থনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তি হতে হবে সুশাসন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত বাজেট, জনগণের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো উন্নয়ন মডেলই সফল হবে না। জনপ্রতিনিধিরা ব্যবসায়ী হবেন না; বরং তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবেন, যেখানে স্থানীয় মানুষ, সমবায় ও উদ্যোক্তারা উৎপাদনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হতে পারবেন।

 

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কেবল সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সময় এসেছে ইউনিয়ন পরিষদকে একটি স্থানীয় উন্নয়ন, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নতুনভাবে কল্পনা করার। যেখানে সরকারি বরাদ্দ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হবে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্য সংযোজন এবং নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।

 

একটি স্বনির্ভর ইউনিয়নই পারে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি স্থাপন করতে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনই প্রয়োজন সাহসী নীতিগত সংস্কার, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং উৎপাদনমুখী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা।

 

— এম মোস্তফা লিমন

সম্পাদক, তৃতীয়বাংলা

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন