নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল সহকারী সম্পাদক, তৃতীয় বাংলা, আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ ০২:৫৩
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্য নিজেকে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক শৃঙ্খলার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে সাম্প্রতিককালের দুটি বড় আন্তর্জাতিক সংকট-রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ,ব্রিটেনের কূটনৈতিক ও আইনি অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক আইনবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, এই দুই সংকটে লন্ডনের অবস্থানের তুলনামূলক পর্যালোচনায় আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগত প্রয়োগ এবং বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যে একটি স্পষ্ট টানাপোড়েন লক্ষ করা যায়।
ইউক্রেন সংকট: আন্তর্জাতিক আইনের দৃঢ় সমর্থক হিসেবে ব্রিটেন
রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই যুক্তরাজ্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, এই আক্রমণ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে লন্ডন বারবার রাশিয়ার কর্মকাণ্ডকে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইউক্রেন-সংক্রান্ত তদন্ত শুরু করলে ব্রিটেন প্রকাশ্যে তা সমর্থন করে এবং তদন্ত কার্যক্রম ও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে সহায়তা প্রদান করে।
এই অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ মনে করে।
গাজা সংকট: আইনি ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়
গাজা সংকটে ব্রিটেনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক। একদিকে লন্ডন বেসামরিক প্রাণহানি কমানোর আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন নিয়ে আলোচনা করে, তখন ব্রিটেনের অবস্থান ইউক্রেন প্রশ্নে নেওয়া অবস্থানের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ও সংযত ছিল। এই পার্থক্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়।
অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিতর্ক হয়েছে। যুক্তরাজ্যের অস্ত্র রপ্তানি নীতি অনুসারে, রপ্তানিকৃত অস্ত্র যদি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স পুনর্বিবেচনা করা যায়। গাজা পরিস্থিতিতে কয়েকটি লাইসেন্স স্থগিত করা হলেও পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। সমালোচকদের মতে, এটি মানবাধিকার উদ্বেগ ও কৌশলগত সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা।
আত্মরক্ষার অধিকার বনাম আনুপাতিকতার প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক আইনে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ এই অধিকার নিশ্চিত করেছে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে আনুপাতিকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নীতি আরোপ করে।
গাজায় সামরিক অভিযানের মাত্রা, মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার এবং বেসামরিক প্রাণহানির প্রশ্নে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের অবস্থান নিয়ে সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইউক্রেন ও গাজার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের নীতি কি একই মানদণ্ডে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
আইনগতভাবে ইউক্রেন ও গাজার পরিস্থিতি একেবারে অভিন্ন নয়। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এটি দুটি স্বীকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত, অন্যদিকে গাজার ক্ষেত্রে বিষয়টি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং একটি অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত।
তথাপি আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলো বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার এবং যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহিতা উভয় ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক।
এ কারণে অনেক গবেষক, আইনবিদ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইনকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে তার প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় আইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি বৈশ্বিক আস্থা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
উপসংহার
ইউক্রেন সংকটে ব্রিটেনের অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দৃঢ় সমর্থনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়েছে। অন্যদিকে গাজা সংকটে তাদের নীতি অনেকের কাছে বেশি সতর্ক, বাস্তববাদী ও কৌশলগত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা এটাই যে, রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই নীতি ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার সমান ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর। যুক্তরাজ্যসহ সকল প্রভাবশালী রাষ্ট্রের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আইনি নীতির মধ্যে এমন ভারসাম্য স্থাপন করা, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হয়।
যুক্তরাজ্য থেকে আরো পড়ুন