এনামুল হক, কলামিস্ট : উন্নয়নের পথে আবারও স্থবির হয়ে পড়েছে সিলেট অঞ্চল। শুধুমাত্র গ্রামীণ জনপদে কয়েকটি রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট করার নামই উন্নয়ন নয় ।
প্রকৃত পক্ষে জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নই হলো প্রকৃত উন্নয়ন।
উন্নয়নের বাস্তব নমুনা সিলেট অঞ্চলে দেখিয়ে গেছেন মরহুম অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। আর এম সাইফুর রহমানের সাথে থেকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কলা কৌশল রপ্ত করে সিলেটের উন্নয়নে আরেক কিংবদন্তির নাম হলো আরিফুল হক চৌধুরী।
নগরে মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে সিলেট নগরের বর্তমান আধুনিক ও দৃষ্টি নন্দন
নগরায়নের অধিকাংশ কৃতিত্ব মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর। যেগুলো আমাদের খুব কাছ থেকে দেখা।
বর্তমান এমপি ও মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পথে মাত্র ছয় মাসেই অগ্রবর্তী হয়েছেন ।
কোম্পানীগঞ্জে চীনের অর্থায়নে এক হাজার শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, সিলেট জাফলং রেল লাইন, জৈন্তাপুর পৌরসভা , লালাখাল পর্যটন স্পটে দৃষ্টি নন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ সহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হয়েছে। কোম্পানিগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুরকে একই যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা এবং তিন উপজেলাকে পর্যটন নগর হিসেবে মহা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন মন্ত্রী আরিফুল হক।
বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় আরেকটি বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই জায়গা অধিগ্রহণের বিষয়ে ডিসি অফিসের খতিয়ান দেখার কাজ আলোচনা শুরু হয়েছে। যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সিলেটের কয়েক হাজার কর্মসংস্থান ও শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে।
শাহজালাল দরগাহ অত্যাধুনিক বিশ্ব মানের কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা, সিলেট ওয়াসা ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিউক) এর প্রতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করাটাও অনেক বড় বিষয়।
২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে যদি তাড়াহুড়ো করে এম সাইফুর রহমান একটি ভাড়া বাড়িতে এসএমপির উদ্বোধন ও বিল পাশ না করে যেতেন সিলেটবাসী মেট্রোপলিটন নিয়ে অনেক দীর্ঘ পথ অপেক্ষামান থাকতেন হতো।
সিলেট নগরে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ড গুলোর স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যেই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে এসেছেন নগর প্রশাসক (মেয়র) কাইউম চৌধুরী। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে।
এই মেগা প্রজেক্ট গুলো বাস্তবায়ন করতে অনেক দেরি হয় কিন্ত প্রজেক্ট গ্রহণ থেকে শুরু করে টাকা ছাড় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যে কতো কঠিন প্রশাসনিক জটিলতা তা কল্পনাতীত।
কিন্ত বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ এমপি নির্বাচনী এলাকার বৃহত্তম উন্নয়নের স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছেনা ।
বেশিরভাগ এমপি গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট এলজিইডির রাস্তা বা মসজিদ মন্দিরে দুই তিন লাখ টাকার অনুদান নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে । ইদানিং রাস্তায় একটা লাইট পোষ্ট স্থাপনের পর এমপিকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে । চিন্তা করা যায় মানুষের চিন্তার সীমানাটা কতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছে ?
একটা বিষয় অনেকেই হয়তো জানেননা যে, এলজিইডির রাস্তা, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটা বছর ব্যাপী রুটিন ওয়ার্ক বা রোডম্যাপ আছে ।
এগুলো এই ডিপার্টমেন্ট গুলো কোন এমপি বা দলীয় সরকার না থাকলেও তাদের রুটিন ওয়ার্কের অংশ হিসেবে মেরামত, সংস্কার, স্কুলের ভবন নির্মাণ এগুলো তারা করে থাকে।
এখানে এমপির নরমালি কোন কৃতিত্ব জাহির করার কিছু নেই ।
তবে এমপি সাহেবের সুপারিশ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ থাকে ।
মাননীয় এমপি সাহেবদের উচিত নিজ নিজ এলাকার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বড় প্রজেক্ট নিয়ে আসা ।
বিশেষ করে সিলেট বিভাগের একুশ জন এমপির উচিত একসাথে সিলেট-ঢাকা মহা সড়ক দ্রুত বাস্তবায়নে সিরিয়াস হওয়া।
তারপর সুনামগঞ্জের উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়েছে। অতীতের অধিকাংশ সরকারের মন্ত্রী পরিষদে সুনামগঞ্জের প্রতিণিধিত্ব ছিল। জাতীয় পার্টির আমলে মেজর ইকবাল সাহেব খাদ্য মন্ত্রী ছিলেন, তারপর পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ও পরবর্তীতে রেলমন্ত্রী বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়া, সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান বিভিন্ন সময় সরকারে প্রতিণিধিত্ব করেছেন ।
কিন্ত বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই প্রথম মন্ত্রী পরিষদে সুনামগঞ্জের কোন জায়গা হয়নি। উল্টো সুনামগঞ্জের উন্নয়নের তদারকি করার জন্য হবিগঞ্জ থেকে একজনকে পাঠানো হয়েছে।
সিলেট ঢাকা মহা সড়ক, সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের
নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের অগ্রগতি ও
বাস্তবায়ন, সিলেট থেকে ছাতক হয়ে সুনামগঞ্জ রেল লাইন, ছাতকে একটি বিসিক শিল্প নগরী, সুনামগঞ্জ,কিশোরগঞ্জ,নেত্রকোনা, এবং মৌলভী বাজারের একাংশ নিয়ে হাওর উন্নয়ন বোর্ড অথবা হাওর মন্ত্রণালয় গঠন, সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের উড়াল সড়ক নির্মাণ সহ কত শত মহা পরিকল্পনা পড়ে আছে ।
এগুলো নিয়ে না কেউ কথা বলছে, না কেউ কোথাও উপস্থাপন করছে ! অতীতের মতো সবাই সবার ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে । ছোটখাট রাস্তা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদানের খবরে ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে ।
ফেসবুক, টিকটক, নেতার সাথে ছবি আর আপলোড, দুর্দিনের কর্মীদের অবমূল্যায়ন, ফ্যাসিবাদী প্রশাসন দ্বারা বেষ্টিত ভূল সিদ্ধান্ত দিনদিন যেন সবকিছু খেই হারিয়ে ফেলতে বসেছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আধিপত্যবাদ বিরুধী ও বহুদলীয় রাজনীতি একজন কল্যাণকামী হিসেবে তারেক রহমানের সরকারকে আমি এখনই ব্যর্থ বা অকার্যকর বলতে প্রস্তুত নই।
কারন চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে দেশটা যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থান থেকে টেনে তুলাটাও একটা সময় স্বাপেক্ষ বিষয়।
তবে সরকারের পলিসি মেকার এবং এমপিদের উন্নয়নের দিকে আরও সিরিয়াস মনোযোগী হলেই অনেক দৃশ্যমান ব্যর্থতার উন্নয়নের কাছে হারিয়ে যাবে। এজন্য এমপিদের কাছে উদাহরণ হতে পারেন মরহুম এম সাইফুর রহমান, এমএ মান্নান ও আরিফুল হক চৌধুরী।
এনামুল হক
প্রেস এন্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি
বাংলা প্রেসক্লাব বার্মিংহাম মিডল্যান্ডস
সিলেট থেকে আরো পড়ুন