মুক্তমত

পাকিস্তানের ছাত্ররাজনীতি কেন গণআন্দোলনের শক্তি হয়ে উঠতে পারছে না?

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:২৫

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের পর সর্বশেষ ভারতে জেনজি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্ষমতার মসনদ নাড়িয়ে দিলেও পাকিস্তানে এরকম কিছু দেখা যায়নি, দেখা যাচ্ছেও না। ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সংগঠিত আন্দোলনগুলো তিন দেশে সরকার পতন ঘটিয়েছে, ভারতে বিজেপির মতো শক্তিশালী সরকারকে অনেকটা নতজানু হতে বাধ্য করেছে। ওদিকে এরকম কোনো ছাত্র বিক্ষোভ-আন্দোলনের আঁচড়টুকুও লাগেনি প্রতিবেশী পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর গায়ে। অথচ বলতে গেলে পাকিস্তানে একটি গণ-যুবঅভ্যুত্থানের সমস্ত উপাদানই বিদ্যমান। অন্তত দেশটির রাজনৈতিক-সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্র সেটাই বলে।

পাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থানের উপাদান আছে কি?
দেশটির অর্থনীতি একের পর এক সংকটে জর্জরিত। বারবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর দেওয়া আর্থিক সহায়তার ওপর তারা টিকে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে যুব বেকারত্বের হারও অনেক বেশি। বিশেষ করে স্নাতকদের মধ্যে বেকারের হার ৩২.৮ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় প্রতি তিনজন স্নাতকের মধ্যে একজন বেকার। আছে তীব্র মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আটা-ময়দার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে।

সম্প্রতি পেশোয়ারে একটি স্কুলের ছাদ ধসে ২৮ জন শিশুসহ প্রায় ২৯ জনের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, লাহোর-রাওয়ালপিন্ডি কলেজে নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি, নানা পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়নে দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ রয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রাজনীতি এবং সুশীল সমাজের একটি বড় অংশের ওপর লৌহকঠিন নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। সেনাবিরোধী অবস্থানের কারণে সরকারের পতন হয়েছে একাধিকবার, শীর্ষ নেতাদের অনেককে আততায়ীর হামলায় প্রাণ হারাতে হয়েছে। সর্বশেষ খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে নাকচ করে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নর শাসন শুরু করেছে।

ছাত্রদের ভাষ্য কী?
সব মিলিয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের এতসব কারণ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানে সে অর্থে শিক্ষার্থীদের কোনো সম্মিলিত আন্দোলন-বিক্ষোভ করতে দেখা যায়না।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো এবং দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান এক এক্স পোস্টে লেখেন, ‘শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল এবং বর্তমানে ভারতে আমরা যেভাবে শিক্ষার্থী-যুবসমাজের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঝড় তুলতে দেখেছি, পাকিস্তানে ঠিক তেমন গণআন্দোলন দেখা যাচ্ছে না কেন? প্রশ্নটা খুবই যৌক্তিক। কারণ এই ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে যে কারণগুলো থাকে—যেমন দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, বেকারত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—তার সবই পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।’

এই ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে যে কারণগুলো থাকে—যেমন দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, বেকারত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—তার সবই পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।’
তবে এটা বলা যাবে না যে পাকিস্তানের তরুণ শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিকভাবে উদাসীন। সম্প্রতি ভারতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলন তাদের ভালোই প্রভাবিত করেছে। সীমান্তের ওপারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করে অনেক তরুণ পাকিস্তানিকে সামাজিক মাধ্যমে সরব হতেও দেখা গেছে। একই সঙ্গে নিজেদের দেশে এমন কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন তারা।

গণমাধ্যমে এক পাকিস্তানি তরুণ বলেন, ‘আমরা যদি কখনো সুযোগ পাই, তবে আমাদেরও এভাবে রাস্তায় নামা উচিত। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’... এরা সত্যি খুব চমৎকার! তারা অহেতুক অতিরিক্ত গম্ভীর বা কঠোর নয়, আর তাদের এই বিষয়টিই আমার পছন্দ।’

এরকম অল্প স্ফুলিঙ্গ দেখা গেলেও পাকিস্তানে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের মতো জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি। পাকিস্তানের ভেতরে তরুণদের সংগঠিত প্রতিবাদ অনেকটাই স্তিমিত।

গণমাধ্যমে এক পাকিস্তানি তরুণ বলেন, ‘আমরা যদি কখনো সুযোগ পাই, তবে আমাদেরও এভাবে রাস্তায় নামা উচিত। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’... এরা সত্যি খুব চমৎকার!
দেশটিতে যে একেবারেই কখনো ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান হয়নি সেটা বলার উপায় নেই। জিয়াউল হকের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিচার বিভাগের ওপর পারভেজ মোশাররফের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবীদের আন্দোলন হয়েছে। বেলুচিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে পাকিস্তানের। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটার মতো উর্বরক্ষেত্র হয়ে উঠলেও সেরকম কিছু বাস্তবে দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পাকিস্তানে ছাত্ররাজনীতির তুলনামূলক দুর্বলতা, ক্যাম্পাসভিত্তিক সক্রিয়তার ওপর কয়েক দশক ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন এবং বিদ্যমান আন্দোলনগুলোর একটি বৃহত্তর ও ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ হয়ে উঠতে না পারার ব্যর্থতা।

সবচেয়ে বড় বাধা জিয়াউল হকের নিষেধাজ্ঞা
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানে ছাত্র রাজনীতির এই অবস্থার পেছনে একাধিক কারণের মূলে যেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আশির দশকে। এই আমলেই মূলত ছাত্ররাজনীতির ওপর খড়গ নামানো হয়েছিল। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসক জেনারেল জিয়াউল হক ১৯৮৪ সালে ছাত্রসংসদ নিষিদ্ধ করেন।

কুগেলম্যান বলছেন, জেনারেল জিয়াউল হক ছাত্রসংসদ নিষিদ্ধ করার পর একাধিক সরকার এলেও এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়নি। পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ শিক্ষার্থী-তরুণ হলেও তাদের বড় কোনো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন নেই। অর্থাৎ ওই নিষেধাজ্ঞার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাবকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা উচিত নয়।’

পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসক জেনারেল জিয়াউল হক ১৯৮৪ সালে ছাত্রসংসদ নিষিদ্ধ করেন।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের এক নিবন্ধে পাকিস্তানের আওয়ামি ওয়াকার্স পার্টি এবং উইমেন্স ডেমোক্রেটিক ফোরামের সংগঠক তুবা সায়িদ লিখেছেন, দেশে ছাত্রশক্তির অবসান ঘটাতে, বিশেষ করে একনায়কতন্ত্র ও অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দমন করতেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। অতীতে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীরা বড় বড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছেন, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আইয়ুব আন্দোলন। জিয়াউলের শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী তাঁর ইসলামীকরণ প্রকল্পকে সমর্থন জানায় এবং ওই একনায়কের ঘোষিত প্রথম মন্ত্রিসভার অংশ হয়ে ওঠে। এর ফলে দলটির ছাত্র শাখা ‘ইসলামী জমিয়াত-ই-তালাবা’ (আইজেটি) একনায়কবিরোধী ছাত্রগোষ্ঠীগুলোর তুলনায় নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

নিবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন, ১৯৭৯ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে আইজেটির কিছু ছাত্র, প্রগতিশীল ছাত্র সমাবেশে গুলি চালায়, যা ছাত্ররাজনীতিতে একে-৪৭ এর মতো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের প্রথম ঘটনা ছিল।

এই নিষেধাজ্ঞাকে বৈধতা দেওয়ার সপক্ষে যে যুক্তিগুলো দেখানো হয়, তার মূল কথা হলো— ছাত্রসংসদগুলো ক্যাম্পাসে সহিংসতা বাড়িয়ে দেয় এবং একাডেমিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। অথচ ১৯৭০-এর দশকে নিষেধাজ্ঞা জারির আগে ছাত্ররাজনীতি ছিল একটি প্রাণবন্ত ক্ষেত্র, যা শিক্ষার্থীদের তাদের অধিকার এবং উন্নত অ্যাকাডেমিক সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে দরকষাকষি করার সুযোগ করে দিত। এটি এমন একটি জায়গাও ছিল যেখানে তরুণরা নির্বাচন ও প্রচারণার মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিত। কিন্তু ছাত্রসংসদ না থাকায় শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খেয়ালখুশি অনুযায়ী ফি নির্ধারণ ও বৃত্তির অর্থ বরাদ্দ করছে। ফলে বহু শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষা থেকেই দূরে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পাকিস্তানের দুর্বল ছাত্ররাজনীতি
রাজনীতির দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় পাকিস্তান ব্যতিক্রম, কারণ সেখানে শক্তিশালী ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্যের অভাব রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সঙ্গে এর স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। এসব দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী ছাত্র ও যুব সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠন রাজনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি ও তা সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানে ছাত্রদের সেরকম সক্রিয়তা দেখা যায় না। তবে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল ‘স্টুডেন্ট সলিডারিটি মার্চ’, যা ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হতো। এর মূল দাবি ছিল ছাত্র সংসদ পুনর্বহাল এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার বৃদ্ধি করা। আন্দোলনকারীদের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও ছাত্র সংসদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়ে গেছে। ফলে পাকিস্তান এমন কোনো সুসংগঠিত ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেনি, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য স্থানে যুব আন্দোলনগুলোকে এগিয়ে নিয়েছে।

ছাত্ররাজনীতির ধারা বন্ধে রাজনৈতিক খরা
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলুর এক নিবন্ধে উঠে এসেছে, পাকিস্তানে আদর্শ ছাত্র রাজনীতির সুযোগ না থাকায় কীভাবে দেশটির মূলধারা রাজনীতির সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হচ্ছে।

নিবন্ধে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং একমাত্র নেতা হিসেবে দুইবার ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত মাহমুদ গজনভি বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি সরকারের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ধারারও প্রতিফলন ঘটাত।’

তিনি স্মরণ করে বলেন, ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের একাডেমিক রেকর্ড, যোগাযোগ ও সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সামগ্রিক সুনামের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ‘সেরা’ শিক্ষার্থীদের বেছে নিত।

ছাত্র সংসদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষতি করেছে।
উর্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তৌসিফ আহমেদ খান বিশ্বাস করেন, ছাত্র সংসদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষতি করেছে। তাঁর মতে, দলগুলো ছাত্র সংসদ থেকে আসা প্রশিক্ষিত নেতৃত্বের বদলে ‘ব্যবসায়ী’ এবং ‘রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের’ দখলে চলে গেছে।

১৯৭৮ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তৌসিফ খান বলেন, ‘গণতন্ত্রই ছিল সামরিক স্বৈরাচারীদের মূল লক্ষ্যবস্তু, তাই তারা সবসময় গণতন্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ওপর আঘাত হেনেছে।’

বিক্ষিপ্ত আন্দোলন জাতীয় হয়ে ওঠেনি কেন?
পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশটিতে আন্দোলন-প্রতিবাদ দেখা গেলেও সেসব আসলে বিক্ষিপ্ত। যেমন—বেলুচিস্তানে আন্দোলনকারীরা দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভ ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা আরও বেশি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, গুমের অবসান এবং প্রদেশের বিপুল খনিজ সম্পদের ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়েছেন। অবশ্য বারবারই তাদের এসব দাবি ‘সহিংসতার’ খবরের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী বেলুচিস্তানের সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ-সন্ত্রাসবাদ এবং ইদানীং ভারত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আনছে।

একইভাবে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির নেতৃত্বে অস্থিরতার একটি ঢেউ দেখা গেছে। সেখানে আকাশছোঁয়া বিদ্যুতের দাম থেকে শুরু করে, স্থানীয় আইন পরিষদের ১২টি আসন শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষণের মতো নানা বিষয় নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

তবে মূল পার্থক্য হলো, এই আন্দোলনগুলো অনেকাংশেই তাদের নিজ নিজ অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিবেশী দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর যুব-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের বিপরীতে, এগুলো এমন কোনো একক আন্দোলনে রূপ নেয়নি। অর্থাৎ জাতীয় আন্দোলন হতে পারেনি যা ইসলামাবাদকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখে।

অনেক তরুণ পাকিস্তানিও একই মূল্যায়ন করেছেন। সম্প্রতি বিবিসি উর্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক তরুণ বলেন, ভারতে সিজেপির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো তাঁরা একটি সাধারণ লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে। পাকিস্তানে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ আমরা পাঞ্জাবি ও পশতুন, সুন্নি ও শিয়া হিসেবে বিভক্ত। আমি মনে করি না পাকিস্তানের জেনজি সেভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে।’

মুক্তমত থেকে আরো পড়ুন