যুক্তরাজ্য

বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিল নির্বাচন ২০২৬: ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের উত্থান ও নতুন রাজনৈতিক বার্তা

মূলধারার রাজনীতিতে কমিউনিটির শক্ত অবস্থান, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চমক

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ ০৩:৫২

 

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল 
সহকারী সম্পাদক, তৃতীয়বাংলা

নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও আইনজীবী,বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য 

 

ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ‘বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিল নির্বাচন ২০২৬’-এর ফলাফল আজ ৮ মে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। গত ৭ মে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ এবং ৮ মে শুক্রবার গণনা শেষে নগরের আগামী চার বছরের জনপ্রতিনিধিদের নাম প্রকাশ করা হয়।

যুক্তরাজ্যের নির্বাচন কমিশনের একজন অনুমোদিত নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে দিনভর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ২২ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রার্থীর অংশগ্রহণ ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

ভোটের দিন: জনজোয়ার ও উৎসবমুখর পরিবেশ

গত ৭ মে সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বার্মিংহামের ৬৯টি ওয়ার্ডে টানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ কাজের আগে এবং সন্ধ্যায় অফিস শেষে কেন্দ্রে এসে ভোট দেন। রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবার কঠোরভাবে ফটো আইডি—যেমন পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স—যাচাই করা হয়। সশরীরে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি পোস্টাল ভোটের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

কেন্দ্রগুলোতে প্রার্থী ও সমর্থকদের সরব উপস্থিতি থাকলেও কোথাও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। কয়েকটি কেন্দ্রে সমর্থকদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনা ঘটলেও দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল

আজ ৮ মে সকাল থেকেই বার্মিংহাম সিটি সেন্টারের ইউটিলিটা এরিনা প্রাঙ্গণে ভোট গণনা শুরু হয়। শহরের ১০১টি আসনের ভাগ্য নির্ধারণী এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নির্বাচন কর্মকর্তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যালট যাচাই ও গণনার কাজ সম্পন্ন করেন। সন্ধ্যার মধ্যেই সব ওয়ার্ডের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

সিটি কাউন্সিলের অফিসিয়াল তথ্যানুসারে, এবারের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর প্রার্থীদের প্রতিও ভোটারদের বিশেষ ঝোঁক লক্ষ্য করা গেছে।

চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়:

রিফর্ম ইউকে — ২২টি আসন গ্রিন পার্টি — ১৮টি আসন কনজারভেটিভ — ১৬টি আসন লেবার — ১৫টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী — ১৩টি আসন লিবারেল ডেমোক্র্যাটস — ১২টি আসন লেবার অ্যান্ড কো-অপারেটিভ পার্টি — ১টি আসন  

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কমিউনিটি

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গর্বের দিক হলো ছয়জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর বিজয়। বিশেষ করে দুই নারী প্রার্থীর জয় কমিউনিটিতে নতুন অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে।

লেবার পার্টি থেকে নিউটাউন ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন রাশেদা বেগম। অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস থেকে অ্যাস্টন ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন মমতাজ হোসেন।

এছাড়াও গ্রিন পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান টাইজলি অ্যান্ড হে মিলস ওয়ার্ডে জয়ী হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন। লেবার পার্টির টিকিটে গ্যারেটস গ্রিন ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন সাদেক মিয়া।

সবচেয়ে আলোচিত ফল এসেছে লজেলস ও অ্যাস্টন ওয়ার্ডে। বড় দলগুলোর প্রার্থীদের পেছনে ফেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লজেলসে বিজয়ী হয়েছেন মো. তাজ উদ্দিন এবং অ্যাস্টনে বিজয়ী হয়েছেন আব্দুল চৌধুরী সুমন।

নতুন রাজনৈতিক বার্তা

লজেলস এবং অ্যাস্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিজয় বার্মিংহামের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে। ভোটাররা এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয়তা, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং কমিউনিটির সমস্যা সমাধানে বাস্তব প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রার্থীদের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং এটি মূলধারার ব্রিটিশ রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও অংশগ্রহণেরই প্রতিফলন।

উৎসবমুখর পরিবেশ, স্বচ্ছ ভোটদান ব্যবস্থা এবং নতুন নেতৃত্বের এই উত্থান বার্মিংহামের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা।

যুক্তরাজ্য থেকে আরো পড়ুন