নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল , যুক্তরাজ্য প্রবাসী আইনজীবি ও কলামিস্ট
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ ১৫:০৮
প্রতি বছর জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্যে উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এঁর মহান ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত এই উৎসবটি ব্রিটিশ মুসলিমদের জীবনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটায়। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩.৯ মিলিয়ন (প্রায় ৩৯ লক্ষ), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.৫ শতাংশ। ব্রিটিশ সমাজের এই বৃহৎ বহুত্ববাদী পরিবেশে শত বাধা, কঠোর আইনি নিয়ম এবং ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মধ্যেও প্রবাসীরা প্রতি বছর টিকিয়ে রেখেছেন কুরবানির ঈদের আমেজ।
ব্রিটেনে ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এখন এক বিশাল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ। ঈদকে ঘিরে তৈরি হয় লাখো পাউন্ডের বাণিজ্য, পরিবারকেন্দ্রিক আয়োজন, চ্যারিটি কার্যক্রম এবং বহুজাতিক সংস্কৃতির এক বর্ণিল উপস্থাপন।
লন্ডনে কুরবানির ঈদ: ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় মুসলিম হাব হলো রাজধানী লন্ডন। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস (হোয়াইটচ্যাপেল, বাংলাটাউন), নিউহ্যাম, রেডব্রিজ (ইলফোর্ড), ওয়ালথাম ফরেস্ট এবং ব্রেন্ট এলাকায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় মুসলিমদের বিশাল বসতি গড়ে উঠেছে।
ঈদের সপ্তাহজুড়ে এই এলাকাগুলোতে দেখা যায় এক ভিন্ন আবহ। মসজিদ, মার্কেট, পোশাকের দোকান, মিষ্টির দোকান এবং রেস্টুরেন্টগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে হোয়াইটচ্যাপেল রোড, গ্রিন স্ট্রিট ও ইলফোর্ড লেন রাত গভীর পর্যন্ত জমজমাট থাকে।
কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক ও বুকিং পদ্ধতি:
যুক্তরাজ্যের ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাক্ট ২০০৬’ (Animal Welfare Act 2006) এবং ‘ওয়েলফেয়ার অব অ্যানিম্যালস অ্যাট দ্য টাইম অব কিলিং’ (WATOK) আইন অনুযায়ী, লাইসেন্সবিহীন স্থানে বা ঘরবাড়িতে/রাস্তায় পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
এই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাজ্যে গড়ে উঠেছে সুসংগঠিত ‘কুরবানি বুকিং সিস্টেম’। ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকেই পূর্ব লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি গ্রোসারি ও মাংসের দোকানগুলো বুকিং নেওয়া শুরু করে।
প্রক্রিয়া: গ্রাহকরা দোকানে গিয়ে অথবা ডেডিকেটেড অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওজনের গরু, ভেড়া বা ছাগল বুকিং দেন। অনেকে আবার যৌথ কুরবানির জন্য সাত ভাগে অংশগ্রহণ করেন।
দামের পার্থক্য: পশুর ধরন, ওজন এবং সরবরাহ সংকটের কারণে প্রতি বছর দাম ওঠানামা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি গরুর অংশের মূল্য ১২০ থেকে ২৫০ পাউন্ড পর্যন্ত উঠেছে।
স্লটারহাউস (Slaughterhouse): এই পশুগুলো যুক্তরাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের (যেমন ওয়েলস, ইয়র্কশায়ার বা স্কটল্যান্ড) অনুমোদিত এবং ‘হালাল ফুড অথরিটি’ (HFA) বা ‘হালাল মনিটরিং কমিটি’ (HMC) দ্বারা সার্টিফাইড স্লটারহাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঈদের নামাজের পর সরকারি ভেটেরিনারি সার্জনদের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ ইসলামী শরিয়াহসম্মত উপায়ে (তাকবীর দিয়ে) জবাই করা হয়।
ডেলিভারি সংকট ও সমাধান: ঈদের দিন বিকেলের পর থেকে শুরু করে পরবর্তী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই মাংস কোল্ড-স্টোরেজ ভ্যানের মাধ্যমে লন্ডনের দোকানগুলোতে আনা হয় এবং গ্রাহকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। দেশের মতো তাৎক্ষণিক কাঁচা মাংস ভাগাভাগির দৃশ্য এখানে খুব কম দেখা গেলেও প্রবাসীরা ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
ডিজিটাল কুরবানি ও বৈশ্বিক চ্যারিটি:
লন্ডনের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন আর স্থানীয়ভাবে কুরবানি না দিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশ, সোমালিয়া, ইয়েমেন, গাজা বা সিরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশগুলোতে কুরবানি পাঠান।
ইসলামিক রিলিফ (Islamic Relief), মুসলিম এইড (Muslim Aid), হিউম্যান আপিল (Human Appeal) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চ্যারিটি সংস্থাগুলোর হেডকোয়ার্টার লন্ডনে হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি পাউন্ডের ফান্ড এখান থেকে সংগৃহীত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল কুরবানির এই প্রবণতা প্রবাসী মুসলিমদের মধ্যে বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্ববোধ আরও শক্তিশালী করেছে।
ঈদের নামাজ ও ট্রাফালগার স্কয়ারের উৎসব:
লন্ডনের ঐতিহাসিক ইস্ট লন্ডন মসজিদ (হোয়াইটচ্যাপেল রোড), ব্রিক লেন মসজিদ এবং সেন্ট্রাল লন্ডন (রিজেন্টস পার্ক) মসজিদে ঈদের দিন সকাল থেকে ৫-৬টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মুসল্লিদের ভিড় সামাল দিতে অনেক এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও করা হয়।
লন্ডনের ঈদের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো মেয়র অব লন্ডনের কার্যালয় কর্তৃক আয়োজিত ‘ঈদ অন দ্য স্কয়ার’ (Eid on the Square)। সেন্ট্রাল লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে ঈদের পরবর্তী উইকএন্ডে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে বিশ্বখ্যাত মুসলিম শিল্পীদের নাসিদ (ইসলামী সংগীত), বিভিন্ন দেশের ফুড স্টল, ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী, শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ইসলামিক আর্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে অমুসলিম ব্রিটিশদের কাছেও ইসলামের শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
বার্মিংহামে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের ঈদ:
যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্মিংহামকে বলা হয় ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। স্মল হিথ, অ্যালাম রক, লোজেলস, স্পার্কব্রুক ও এস্টনের মতো এলাকাগুলোতে ঈদের সময় মনে হয় যেন বাংলাদেশের কোনো চেনা শহর।
ঈদ উপলক্ষে এসব এলাকায় মার্কেটগুলোতে মধ্যরাত পর্যন্ত কেনাকাটা চলে। বাংলাদেশি মিষ্টির দোকান, রেস্টুরেন্ট এবং কাপড়ের শোরুমগুলোতে বাড়তি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
চাঁদ রাতের ‘মেহেদী উৎসব’:
ঈদের আগের রাতে বার্মিংহামের অ্যালাম রক রোড, লোজেলস রোড এবং কভেন্ট্রি রোডের দৃশ্য দেখার মতো হয়। স্থানীয় কাউন্সিলরদের বিশেষ অনুমতি নিয়ে রাস্তার পাশে অস্থায়ী মেহেদী স্টল বসে।
খরচ: সাধারণ ডিজাইনের জন্য প্রতি হাত ৫ থেকে ১০ পাউন্ড এবং পুরো হাত ও পায়ের জমকালো ব্রাইডাল/অ্যারাবিক ডিজাইনের জন্য ২০ থেকে ৫০ পাউন্ড পর্যন্ত রাখা হয়।
নারী উদ্যোক্তা: এই মৌসুমে অসংখ্য তরুণী ও গৃহিণী অস্থায়ীভাবে মেহেদী আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন, যা অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাতভর উৎসব: গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাকাটা, স্ট্রিট ফুড, কফি আড্ডা এবং উৎসবের আমেজ।
ইউরোপের বৃহত্তম ঈদ জামাত:
স্মল হিথ পার্ক বার্মিংহামের গ্রিন লেন মসজিদের উদ্যোগে প্রতি বছর স্মল হিথ পার্কে খোলা আকাশের নিচে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এখানে প্রায় ৭০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। নামাজের পর পার্কটি একটি বিশাল ফ্যামিলি ফানফেয়ারে (Funfair) রূপ নেয়, যেখানে বাচ্চাদের রাইড, আইসক্রিম, বারবিকিউ এবং বিভিন্ন হালাল খাবারের স্টল বসে।
স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেটি খাবার ও পারিবারিক ঐতিহ্য:
বার্মিংহামের বাংলাদেশিদের ঘরে ঘরে ঈদের দিন ঐতিহ্যবাহী সিলেটি খাবারের সমাহার ঘটে। গরুর মাংসের সাতকরা,আখনি পোলাও,সিলেটি হান্দেশ,চটপটি, কাবাব এবং সেমাইয়ের সুবাসে ম ম করে প্রতিটি ঘর।
প্রবাসী পরিবারগুলো ঈদের দিনে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাওয়াত দেন। অনেক অমুসলিম ব্রিটিশ প্রতিবেশীকেও ঈদের খাবারে আমন্ত্রণ জানানোর সংস্কৃতি এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের ঈদ বনাম ব্রিটেনের ঈদ, আমেজের পার্থক্য:
প্রবাসে ঈদের সব আয়োজন থাকলেও বাংলাদেশের ঈদের সঙ্গে ব্রিটেনের ঈদের একটি বড় পার্থক্য হলো সামগ্রিক সামাজিক আমেজে। বাংলাদেশে ঈদ যেন পুরো দেশের উৎসব রাস্তা-ঘাট, পশুর হাট, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, বাড়ির সামনে কুরবানি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মাংস ভাগাভাগি এবং কয়েকদিনজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ ঈদকে এক অনন্য আবেগে রূপ দেয়।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ঈদ অনেক বেশি কমিউনিটি-কেন্দ্রিক ও নিয়ন্ত্রিত। এখানে আইনি বিধিনিষেধ, কর্মব্যস্ত জীবন এবং সরকারি ছুটি না থাকায় দেশের মতো সর্বব্যাপী উৎসবের আবহ তৈরি হয় না। তবে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল, ইলফোর্ড কিংবা বার্মিংহামের লোজেলস ও স্মল হিথের মতো বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলো ঈদের সময় এক টুকরো বাংলাদেশের রূপ নেয়। মসজিদের ভিড়, চাঁদ রাতের কেনাকাটা, মেহেদী উৎসব, বাংলা খাবার এবং পারিবারিক আড্ডার মাধ্যমে প্রবাসীরাও দেশের সেই আবেগ ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
তবুও অধিকাংশ প্রবাসীর মতে, “দেশের ঈদ” এর আবেগ, আত্মীয়তার বন্ধন ও স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ এখনো আলাদা এবং তুলনাহীন।
ট্রেন্ডিং ফ্যাশন ও বিনোদন, ঈদের নতুন মাত্রা:
প্রবাসে কুরবানির ধর্মীয় রীতিনীতির সমান্তরালে ঈদের পোশাকের নতুন ট্রেন্ড এবং সিনেমা দেখার সংস্কৃতি এখন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
ঈদের পোশাকের লেটেস্ট ট্রেন্ড:
যুক্তরাজ্যের বৈরী আবহাওয়া ও মাল্টিকালচারাল ট্রেন্ডকে মাথায় রেখে এবার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও এশিয়ান নারীদের পোশাকে এসেছে বড় পরিবর্তন।
শারারা ও কুর্তি-লেহেঙ্গা সেট: এবারের ঈদে তরুণীদের মাঝে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ভারী এমব্রয়ডারি, জারি ও সিকুইন ওয়ার্কের শারারা সেট । এর পাশাপাশি সিল্ক ও অর্গানজা ফ্যাব্রিকের ওপর কুর্তি ও লেহেঙ্গা স্কার্টের কম্বিনেশন বেশ নজর কাড়ছে।
ফ্রন্ট-স্লিট আনারকলি: ঐতিহ্যবাহী আনারকলির ডিজাইনকে এবার নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। সিগারেট ট্রাউজারের সাথে সামনে চেরা (Front-slit) লং আনারকলি কুর্তা এবং স্ট্রাকচার্ড জ্যাকেট লেয়ারিং এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ট্রেন্ডিং।
মডেস্ট ফ্যাশন: হিজাব-ফ্রেন্ডলি মডেস্ট ফ্যাশনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ডিজাইনার এখন পশ্চিমা কাটের সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় করছেন।
রঙ ও কাপড়ের ধরণ: দিনের বেলার অনুষ্ঠানের জন্য পাউডার ব্লু, ল্যাভেন্ডার ও ব্লাশ পিংকের মতো প্যাস্টেল শেড যেমন চলছে, তেমনি রাতের ফ্যামিলি ডিনারে রাজকীয় লুক দিতে ভেলভেট ও সিল্কের তৈরি এমারেল্ড গ্রিন, রয়্যাল ব্লু ও ডিপ বারগান্ডি রঙের পোশাকের বিপুল চাহিদা দেখা যাচ্ছে গ্রিন লেন বা হোয়াইটচ্যাপেলের বুটিক শপগুলোতে।
পুরুষদের ফ্যাশন: পুরুষদের জন্য কটন ও লিনেনের ট্র্যাডিশনাল এম্ব্রয়ডারি পাঞ্জাবির পাশাপাশি অ্যারাবিক জুব্বা, থোব এবং মিনিমালিস্ট ওয়েস্টকোটের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।
ঈদের নতুন সিনেমা ও বিনোদন সংস্কৃতি:
ঈদের ছুটিতে এখন প্রবাসীদের বিনোদনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম।
সিনেমাহলে ভিড়: যুক্তরাজ্যের সিনেওয়ার্ল্ড বা ওডিয়ন সিনেমা হলগুলোতে ঈদের বিশেষ রিলিজ হিসেবে অ্যাকশন-থ্রিলার, ড্রামা ও ফ্যামিলি ঘরানার সিনেমা দেখার ধুম পড়ে।
বাংলা কনটেন্টের জনপ্রিয়তা: বিশেষ করে ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ তারকাদের বিগ-বাজেট প্রজেক্ট এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন বাংলা সিরিজ ও চলচ্চিত্র দেখতে পরিবারসহ দর্শকরা ভিড় জমান।আন্তর্জাতিক ছবির জোয়ার: বাংলা ছবির পাশাপাশি হলিউডের বড় অ্যানিমেটেড ফিল্ম, মার্ভেল বা থ্রিলার সিনেমা এবং উর্দু-হিন্দি কমেডি ছবিগুলো দেখতেও তরুণ প্রজন্ম ঈদের দিনগুলোতে অগ্রিম টিকিট বুকিং দিয়ে রাখছে।
ঘরোয়া বিনোদন: অনেক পরিবার আবার ঈদের রাতে ঘরোয়া বারবিকিউ, কুইজ নাইট, অনলাইন গেমিং অথবা পারিবারিক সিনেমা নাইটের আয়োজনও করেন।
ব্রিটিশ সমাজে ঈদের চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক প্রভাব:
যুক্তরাজ্যের মতো একটি পশ্চিমা দেশে মুসলিমদের এই উৎসব উদযাপনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
ছুটির সংকট : যুক্তরাজ্যে ঈদ কোনো সরকারি ছুটি বা ব্যাংক হলিডে নয়। ফলে চাকরিজীবীদের ঈদের দিন সকালের নামাজ পড়েই কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। অনেকে তাঁদের বার্ষিক ছুটি অগ্রীম বুকিং দিয়ে রাখেন ঈদের এই দিনটির জন্য।
সম্প্রতি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা ঈদের দিন অলিখিত ছুটি পেয়ে থাকেন।
আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা: গ্রীষ্মকাল হলেও যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অনিশ্চিত। অনেক সময় ঈদের জামাতে বৃষ্টি বা ঠান্ডা বাতাস উৎসবের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে।
মাংসের তিন ভাগের সঠিক বণ্টন: প্রবাসে আত্মীয়-স্বজন কম থাকায় এবং আইনি জটিলতায় রাস্তার দরিদ্রদের মাংস সরাসরি বিতরণ করা যায় না। তাই প্রবাসীরা মাংসের একটি বড় অংশ স্থানীয় ফুড ব্যাংক (Food Banks), গৃহহীনদের শেল্টার হোম অথবা চ্যারিটি সংস্থাগুলোতে দান করে দেন।
ইসলামোফোবিয়ার উদ্বেগ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অনেক মুসলিম পরিবার নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সচেতন থাকেন। তবে স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং ও আন্তধর্মীয় সংলাপ পরিস্থিতি অনেকাংশে ইতিবাচক রেখেছে।
বহুসংস্কৃতির সেতুবন্ধন:
ব্রিটেনে ঈদ এখন শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসব নয়; এটি ধীরে ধীরে ব্রিটিশ বহুসংস্কৃতির একটি দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠেছে। স্কুল, কাউন্সিল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঈদ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময়, বিশেষ খাবার আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখন নিয়মিত দৃশ্য।
পরিশেষে বলতে হয়, যুক্তরাজ্যের বুকে কুরবানির ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি ব্রিটিশ মুসলিমদের পরিচয়, সংস্কৃতি এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। কঠোর আইনি নিয়ম মেনে, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায়, ফ্যাশনের নতুন ট্রেন্ডে নিজেকে সাজিয়ে এবং সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে যেভাবে প্রবাসীরা ত্যাগের মহিমা ও সম্প্রীতির বন্ধনকে ধরে রেখেছেন, তা ব্রিটিশ মাল্টিকালচারালিজমের এক অনন্য উদাহরণ।
প্রবাসের ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মাঝেও ঈদুল আজহা মুসলিম পরিবারগুলোকে একত্র করে, শেকড়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এবং নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের সব মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ ভাল কাটুক, আল্লাহপাক সবার কুরবানিকে কবুল করুন।
সবাইকে ঈদের অগ্রীম শুভেচ্ছা- ঈদ মোবারক।
যুক্তরাজ্য থেকে আরো পড়ুন