প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:১৯
লন্ডন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬: একই সময়ে পাঁচটি ফুল-টাইম সরকারি চাকরি, সপ্তাহে কাজের চুক্তিবদ্ধ সময় ১৮৩ ঘণ্টা এবং প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড আয়ের অভিযোগ। যুক্তরাজ্যের ইস্ট লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলের বাসিন্দা কাশিম চৌধুরীকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর একটি প্রতারণার মামলা চলছে সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে। ৫৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজের একাধিক চাকরির তথ্য গোপন করে বিভিন্ন সরকারি বিভাগ ও সংস্থায় একসঙ্গে চাকরি করেছেন। তবে অভিযুক্ত তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মামলার বিচার চলছে।
পাঁচটি ফুল-টাইম চাকরি, সপ্তাহে ১৮৩ ঘণ্টার চুক্তি
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ও দ্য স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতে শুনানির শুরুতে প্রসিকিউশন জানায়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটটি নিয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কাশিম চৌধুরীর চাকরির সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই সময়ের মধ্যে তিনি প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড আয় করেছেন বলে আদালতে জানানো হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৩ সালের মে মাসে তিনি একই সময়ে পাঁচটি ফুল-টাইম চাকরির বেতন পাচ্ছিলেন। তাঁর বিভিন্ন চাকরির চুক্তিবদ্ধ কর্মঘণ্টা একত্রে সপ্তাহে ১৮৩ ঘণ্টায় পৌঁছেছিল বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। অথচ এক সপ্তাহে মোট ১৬৮ ঘণ্টা থাকে। ফলে একই সময়ে এতগুলো চাকরির দায়িত্ব বাস্তবে কীভাবে পালন করা সম্ভব ছিল, তা মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, কাশিম চৌধুরী ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের এপ্রিলে তিনি পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তর (Defra)-এ আরেকটি চাকরি নেন বলে অভিযোগ। প্রসিকিউশনের বক্তব্য, দুই প্রতিষ্ঠানে তাঁর চাকরি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পাশাপাশি চলেছিল।
২০২২ সালে তিনি চার মাসের জন্য ইস্ট লন্ডন এনএইচএস ট্রাস্টেও কাজ করেছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়। পরে তাঁর চাকরির তালিকায় স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যা বিভাগ (DHSC), ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি (UKHSA), ব্যবসা ও বাণিজ্য বিভাগ এবং ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সির মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে। হোম অফিসেও তাঁর চাকরি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, চাকরির আবেদন করার সময় তিনি আগে থেকে থাকা চাকরিগুলোর তথ্য গোপন করেছিলেন এবং নিজের কর্মসংস্থানের অবস্থা সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়েছিলেন। এসব তথ্য নিয়োগকারী সংস্থাগুলো জানলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হতো কি না, তা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ ও অসুস্থতার দাবি
করোনাভাইরাস মহামারির সময় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কাশিম চৌধুরী একাধিক চাকরি গোপনে চালিয়ে গিয়েছিলেন।
আদালতে বলা হয়, তিনি তাঁর অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে একাধিক চাকরির দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাঁর কাজের মান ও কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি কিছু চাকরিতে অসুস্থতার কারণে ছুটি নিয়েও অন্য চাকরিতে কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। আদালতে তাঁর অসুস্থতার ছুটির কাগজপত্র এবং বিভিন্ন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।
ভিডিও কলে অসুস্থ দেখানোর অভিযোগ
মামলার আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ২০২৩ সালের মে মাসের একটি ভিডিও কলের ঘটনা। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির ব্যবস্থাপক আলিশা অ্যাডামস তাঁর অনুপস্থিতি ও অসুস্থতার ছুটি নিয়ে আলোচনা করতে একটি ভিডিও বৈঠকের আয়োজন করেন।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য, ওই বৈঠকে কাশিম চৌধুরীর মুখে সাদা মেকআপের মতো পদার্থ দেখা যায়, যা তাঁকে অসুস্থ দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তাঁর মুখ ও গলার রঙের পার্থক্যও ব্যবস্থাপকের নজরে আসে বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
প্রসিকিউটর লুসি অর্গানের দাবি, ঘটনাটি অভিযুক্তের কথিত অসততার একটি উদাহরণ। তবে এটি প্রসিকিউশনের অভিযোগ ও আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্যের অংশ, চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।
কীভাবে সামনে এল বিষয়টি?
আদালতে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থান ও বেতনসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে মিল খুঁজতে গিয়ে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। ন্যাশনাল ফ্রড ইনিশিয়েটিভের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে একাধিক চাকরির সম্ভাব্য অসংগতি শনাক্ত হওয়ার পর তদন্ত শুরু হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
বিচারাধীন মামলা, অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের
কাশিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতারণাসংক্রান্ত নয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে বলে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে। তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করা কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি। ফলে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না।
সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের সরকারি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া, কর্মসংস্থানের তথ্য যাচাই এবং দূর থেকে কাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সময়ে একাধিক চাকরি করা সব ক্ষেত্রে বেআইনি নয়; তবে নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ, তথ্য গোপন কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে বেতন নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি গুরুতর আইনি পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
মামলার নিষ্পত্তি হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সূত্র: The Independent, The Standard এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
রাবেয়া বসরী।
যুক্তরাজ্য থেকে আরো পড়ুন