রাজনীতি

দুপুরে পদত্যাগ, ‘অভিমানে’ ফেসবুকে লিখলেন ইশরাক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:২২

মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা অবশেষে নিজেই দিলেন যুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। পিস্তল উঁচিয়ে অভিযানের পর সমালোচনার মুখে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এই সংবাদের পর ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট দিচ্ছিলেন ইশরাক। এসব পোস্টের প্রথম দিকে ছিল অস্বীকার, এবং পরে এসে জানালেন আজ সোমবার তিনি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন।

সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক হোসেন নিজের পদত্যাগের কথা জানান। পদত্যাগের ঘোষণার এ পোস্টে ঝরেছে তার কিছুটা অভিমানও; সঙ্গে ছিল মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।

পোস্টে ইশরাক হোসেন লিখেছেন, তিনি আজ বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন।

পোস্টে ইশরাক হোসেন আরও লেখেন, ‘ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।

‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশা আল্লাহ।

‘পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে।

‘দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব।

‘মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল!

‘মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!’

উল্লেখ্য, গতকাল রোববার সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়ান। তাঁদের একজন এক তরুণকে লাথি দেন। কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ, স্যার।’

আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে পারেন কি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। এতে তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। কর্মসূচিটি পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছিল।

ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার আগে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম সামনে আসে। ঘটনা নিয়ে সরকার ও দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও তিনি হামলা-ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়। মিষ্টির পদত্যাগের আড়াই সপ্তাহের মধ্যে এবার অস্ত্রকাণ্ডে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করা কর্মকাণ্ডের পর পদত্যাগের নির্দেশ এল।

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন