আন্তর্জাতিক

হাতুড়ি ভেঙেছে, থামেনি জাতিসংঘের আলোচনা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ ১৭:০০

আমেরিকায় এসে প্রথম যে জায়গাটি দেখতে গিয়েছিলাম, সেটি ছিল ইস্ট রিভারের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা জাতিসংঘ সদর দপ্তর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংস্থাটির মহাসচিব ছিলেন বার্মার উ থান্ট। সেই যুদ্ধের স্মৃতি মনে পড়লে আরেকটি দৃশ্যও চোখের সামনে ভেসে ওঠে— জহির রায়হানের অমর প্রামাণ্যচিত্র "স্টপ জেনোসাইড"।

মাত্র ২০ মিনিটের সেই চলচ্চিত্রটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেওয়ার এক অসাধারণ প্রচেষ্টা। ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নগ্ন শিশু জাতিসংঘ সনদের ওপর প্রস্রাব করছে। দৃশ্যটি ছিল প্রতীকী— যখন গণহত্যা চলছিল, তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাটির অসহায়ত্ব ও সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক নির্মম প্রশ্ন।

বছরের পর বছর জাতিসংঘকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কোথাও যুদ্ধ থামাতে পারেনি, কোথাও গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, কোথাও ভেটো রাজনীতির কাছে বন্দী হয়েছে। তবু এটাও সত্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, শান্তিরক্ষা, শরণার্থী সুরক্ষা কিংবা বৈশ্বিক সহযোগিতার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম এখনও জাতিসংঘই।

বাংলাদেশ এ সংস্থার তুলনামূলক নবীন সদস্য। কিন্তু গত পাঁচ দশকে পৃথিবীর জন্য আমাদের অবদান ছোট নয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা, জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নেতৃত্ব, উন্নয়নশীল বিশ্বের পক্ষে কণ্ঠস্বর— এসব আমাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। সেই কারণেই হয়তো চার দশকের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন একজন বাংলাদেশি। ১৯৮৬ সালে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। ২০২৬ সালে ড. খলিলুর রহমান। এই দুই নামের মাঝখানে রয়েছে ৪০ বছরের ইতিহাস।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি অনেকের কাছে আনুষ্ঠানিক মনে হতে পারে। বাস্তবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আসনগুলোর একটি। ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা, আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ, সংকটময় মুহূর্তে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা এবং বিশ্বনেতাদের মধ্যে কূটনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরির দায়িত্ব এই পদের ওপরই বর্তায়।

অনেকে ভুল করে মনে করেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকে। বাস্তবে তা নয়। তিনি সেনাবাহিনী পরিচালনা করেন না, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন না, যুদ্ধ থামানোর নির্দেশও দিতে পারেন না। কিন্তু তিনি আলোচনার মঞ্চ তৈরি করেন। আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় একটি মঞ্চই ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নয়। ১৯৬০ সালে আইরিশ কূটনীতিক ফ্রেডরিক বোল্যান্ড জাতিসংঘের ইতিহাসের অন্যতম অস্থির অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনায় সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ টেবিলে জুতা দিয়ে আঘাত করে বক্তৃতা বাধাগ্রস্ত করেছিলেন। অধিবেশন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বোল্যান্ডের ব্যবহৃত কাঠের হাতুড়িই ভেঙে যায়। কিন্তু তিনি অধিবেশন চালিয়ে যান। ইতিহাসে সেই ঘটনা এখনও জাতিসংঘের প্রতীকী মুহূর্তগুলোর একটি।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর সময়ও পৃথিবী শান্ত ছিল না। ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। শীতল যুদ্ধের বিভক্ত বিশ্বে তিনি সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে নামিবিয়ার স্বাধীনতা এবং বর্ণবাদবিরোধী অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন গতি পায়। বিশ্ব শান্তিতে অবদানের জন্য তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের "মহাত্মা গান্ধী শান্তি পদক" (Mahatma Gandhi Peace Prize)-এ ভূষিত করা হয়।

এখন ইতিহাসের চাকা আবার বাংলাদেশের দিকে ঘুরেছে।

আগামী সেপ্টেম্বরে ড. খলিলুর রহমান যখন ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতির আসনে বসবেন, তখন বিশ্ব এক জটিল সময় অতিক্রম করবে। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা, গাজা সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জলবায়ু বিপর্যয়, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা— সবকিছু একসঙ্গে জাতিসংঘের দরজায় কড়া নাড়ছে।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হতে পারে আরেকটি। ড. খলিলুর রহমানের মেয়াদকালেই জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এটি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; আগামী দশকে জাতিসংঘ কোন পথে হাঁটবে, সেই দিকনির্দেশনা নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক মেরুকরণও সাধারণ পরিষদের আলোচনাকে প্রভাবিত করবে। এমন এক সময়ে সভাপতির চেয়ারে বসে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, সব পক্ষকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং আলোচনার পরিবেশ ধরে রাখা হবে বড় পরীক্ষা। একই মঞ্চে বক্তৃতা করবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়া, চীন এবং ইরানের শীর্ষ নেতারা। সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কের তাপমাত্রা সাধারণত নাতিশীতোষ্ণই থাকে। তবে এবারের কূটনৈতিক আবহাওয়া কতটা উষ্ণ হবে, তা এখনই বলা কঠিন।

বাংলাদেশের জন্য এটিও একটি সুযোগ। এক সময় আমরা ছিলাম যুদ্ধবিধ্বস্ত, সাহায্যনির্ভর একটি দেশ। আজ আমরা বিশ্বের বৃহত্তম শান্তিরক্ষী দেশগুলোর একটি, জলবায়ু ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মুখপাত্র এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি স্বীকৃত কণ্ঠস্বর।

জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে দাঁড়ালে এখনও *স্টপ জেনোসাইড*-এর সেই শিশুটির কথা মনে পড়ে। যে শিশু একসময় প্রশ্ন তুলেছিল বিশ্বের নীরবতার বিরুদ্ধে। আজ সেই একই দেশের একজন কূটনীতিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চের সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ অগ্রযাত্রার প্রতীক।

আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন